বাংলাদেশে সরকার বদলায়, থামে না রাজনৈতিক সহিংসতা
বাংলাদেশে সরকার ও রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও রাজনৈতিক সহিংসতা থামছে না। আসকের হিসাবে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৬৭টি রাজনৈতিক সংঘর্ষে ৯৪ জন নিহত এবং ৩ হাজার ৫৮৭ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ১১২টি ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৮ জন। বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, দলীয় আধিপত্য বিস্তার, ব্যবসা-বাণিজ্য, জমি ও ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণের বিরোধ সহিংসতার অন্যতম কারণ। জাতীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ের ক্ষমতার লড়াই—সব ক্ষেত্রেই অব্যাহত রয়েছে সংঘর্ষ ও প্রাণহানি।

ছবি : ছবি : সংগৃহীত২৪ঘন্টা অনলাইন: ২৪ঘন্টা অনলাইন : বাংলাদেশে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে একাধিকবার। পরিবর্তন এসেছে সরকারে, বদলেছে রাজনৈতিক সমীকরণ। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতারও সূচনা হয়েছে। ২০২৬ সালে বিএনপি আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরেছে। কিন্তু এত পরিবর্তনের পরও থামেনি রাজনৈতিক সংঘর্ষ, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও হত্যাকাণ্ড। বরং স্থানীয় পর্যায়ে আধিপত্য বিস্তার, ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ এবং দলীয় পদ দখলকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ধারাবাহিকতা এখনো দৃশ্যমান।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ৪৬৭টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৯৪ জন। আহত হয়েছেন ৩ হাজার ৫৮৭ জন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, এসব সংঘর্ষের একটি বড় অংশ ঘটেছে একই রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে।
আসকের হিসাব অনুযায়ী, ওই নয় মাসে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ১১২টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন ১৮ জন এবং আহত হয়েছেন ১ হাজার ২১৫ জন। অর্থাৎ রাজনৈতিক সহিংসতার বড় একটি অংশের পেছনে রয়েছে নিজ দলের মধ্যকার বিরোধ।
ক্ষমতার পালাবদল, কিন্তু বদলায়নি সংঘাতের কারণ
গত ১৮ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের পাইস্কায় যুবদল নেতা রিপন মিয়াকে ধাওয়া করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের ভাষ্য, একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অতিথি তালিকায় কারা থাকবেন, তা নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ থেকে এই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত।
রিপনের মেয়ে শীলা গণমাধ্যমকে জানান, কয়েকজন ব্যক্তি তার বাবাকে ধাওয়া করে কুপিয়ে হত্যা করেন। স্থানীয় বিএনপি সভাপতি ঘটনাটিকে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করেছেন।
এ ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি চুয়াডাঙ্গায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের সংঘর্ষে দুই ভাই নিহত হন। ইফতারের পর একটি বিতর্ক থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। নিহতদের একজন হাফিজুর রহমান। অন্যজন তার ভাই ও স্থানীয় জামায়াত নেতা মফিজুর রহমান। পরে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।
এসব ঘটনা দেখায়, জাতীয় রাজনীতিতে পরিবর্তন এলেও স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় প্রভাব বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্ব সহজে শেষ হচ্ছে না।
দুই দশকের পরিসংখ্যানেও একই চিত্র
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সংঘর্ষের ধরন ও পক্ষ বদলালেও সহিংসতার প্রবণতা থেকে গেছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহানের ২০১৪ সালের গবেষণা 'Political Parties in Bangladesh'-এ উদ্ধৃত আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ২৮৪টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় নিহত হন ৫৫ জন। একই সময়ে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে প্রাণ হারান ৩৭ জন।
ওই সময় বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ১৩৪টি সংঘর্ষে আটজন এবং আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে ৪২টি সংঘর্ষে সাতজন নিহত হন।
২০০৭ ও ২০০৮ সালে সামরিক বাহিনী-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাজনৈতিক সংঘর্ষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। তবে এর পেছনে জরুরি আইন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিধিনিষেধ এবং দলগুলোর সংগঠিত হওয়ার সুযোগ সীমিত হওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। ওই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় মোট নয়জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর দলটির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ আবার বেড়ে যায়। ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে আওয়ামী লীগের ৭৯৯টি অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে ৯৭ জন নিহত হন। একই সময়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের সংখ্যা ছিল ২২৯টি এবং নিহত হন ২১ জন।
এসব পরিসংখ্যান কোনো নির্দিষ্ট সরকারকে তুলনামূলকভাবে ভালো বা খারাপ প্রমাণ করার জন্য নয়। বরং ক্ষমতাসীন দলের ভেতরেও কীভাবে সংঘাত ও প্রাণহানির পুনরাবৃত্তি ঘটে, তা তুলে ধরে।
নির্বাচন ঘিরে সহিংসতায় প্রাণহানি বেশি
রাজনৈতিক সহিংসতার সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। ২০১৩ সালে নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে আসক ৫০৭ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করে। হরতাল ও অবরোধ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করেও ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। সংস্থাটির হিসাবে, হরতালজনিত সহিংসতায় ১৮৫ জন এবং অবরোধ কর্মসূচিতে আরও ৮৫ জন নিহত হন।
একই বছর জামায়াত, শিবির ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষেও বহু প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। তবে এসব পরিসংখ্যান সংঘর্ষে অংশ নেওয়া পক্ষগুলোকে চিহ্নিত করে; প্রতিটি মৃত্যুর জন্য কোনো নির্দিষ্ট পক্ষকে দায়ী করে না।
শুধু জাতীয় নির্বাচন নয়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনও সহিংসতার বড় কারণ হয়ে উঠেছে। ২০১৬ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ১৪৭ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করে আসক। ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে সহিংসতায় প্রাণ হারান ১১৩ জন।
অর্থাৎ স্থানীয় পর্যায়ে একটি পদ বা জনপ্রতিনিধিত্বের নিয়ন্ত্রণও অনেক ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী সংঘর্ষের কারণ হয়ে উঠেছে।
দলীয় বিরোধের আড়ালে ব্যবসা ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ
রাজনৈতিক সংঘর্ষের পেছনে শুধু আদর্শিক বিরোধ বা নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা কাজ করে না। অনেক ক্ষেত্রে এর সঙ্গে যুক্ত থাকে অর্থনৈতিক স্বার্থ।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের একটি গবেষণায় ২০০৮ থেকে ২০১৩ সালের রাজনৈতিক সহিংসতার বিভিন্ন কারণ বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দলীয় অভ্যন্তরীণ আধিপত্য বিস্তারের লড়াইকে সহিংসতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি ঠিকাদারি, জমি, সম্পত্তি ও চাকরিসংক্রান্ত বিরোধও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক পরিচয় অনেক সময় ব্যবসা পরিচালনা, সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়া কিংবা প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগের পথ তৈরি করে। ফলে দলীয় পদ বা এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারানো মানে কারও কারও কাছে অর্থনৈতিক সুবিধা ও প্রভাব হারানোও।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর এই বাস্তবতার নতুন দিক সামনে আসে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিভিন্ন এলাকায় আগে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যবসা, পরিবহন, বাজার, জমি ও ঠিকাদারি কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন বিরোধ তৈরি হয়।
চট্টগ্রামের চান্দগাঁওয়ে ২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর বিএনপির দুটি পক্ষের সংঘর্ষে জুবায়ের উদ্দিন বাবু নিহত হন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি কৃত্রিম ঘাসের খেলার মাঠ বা টার্ফের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত।
প্রথম আলোর একটি অনুসন্ধানে চট্টগ্রামে হত্যা, হামলা, সংঘর্ষ ও জমি দখলের ১৫টি ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সরকার পরিবর্তনের পর বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও অবৈধ আয়ের উৎসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছিল। পরিবহন, বাজার, জমি এবং রেলওয়ের ঠিকাদারি ছিল এসব বিরোধের অন্যতম ক্ষেত্র।
বিএনপির ক্ষমতায় ফেরার আগেই বেড়েছিল অভ্যন্তরীণ কোন্দল
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিএনপি জাতীয় ক্ষমতায় ফেরার আগেই দলটির বিভিন্ন পর্যায়ে সংঘর্ষ ও অভ্যন্তরীণ বিরোধ দেখা যায়।
২০২৫ সালে আসকের হিসাবে বিএনপির বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ১৯২টি সংঘর্ষে ৪০ জন নিহত হন। যুবদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলেও প্রাণ হারান আরও আটজন।
একই বছর বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের মধ্যে ৩৩টি সংঘর্ষের ঘটনা নথিভুক্ত হয়। এতে তিনজন নিহত এবং ৫২০ জন আহত হন।
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩৭টিতে। এসব ঘটনায় ১০ জন নিহত এবং ১ হাজার ৫৪ জন আহত হন।
একই সময়ে নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপিও সংঘাতের বাইরে থাকতে পারেনি। আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এনসিপি-সংশ্লিষ্ট নয়টি সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত ও ১৭১ জন আহত হন। ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও ২৯টি সংঘর্ষে ২২০ জন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। এসব ঘটনার বেশিরভাগই বিএনপির সঙ্গে সংঘর্ষের।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সহিংসতা আলাদা বাস্তবতা
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এবং সেই সময়কার রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নকে সাধারণ রাজনৈতিক সংঘর্ষের সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন। প্রতিবেদনে তৎকালীন সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীর পরিকল্পিত দমন-পীড়নের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।
আসকের ২০২৪ সালের সাধারণ রাজনৈতিক সহিংসতার তালিকায় ১০০ জনের মৃত্যুর তথ্য থাকলেও তা জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত মানুষের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নয়। সংস্থাটি আন্দোলনকালীন মৃত্যুর হিসাব আলাদাভাবে বিবেচনা করেছে।
এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, গণআন্দোলন এবং স্থানীয় পর্যায়ের দলীয় আধিপত্যের সংঘর্ষ এক ধরনের ঘটনা নয়। এগুলোর কারণ ও দায় নির্ধারণের পদ্ধতিও আলাদা।
সরকার কঠোর হওয়ার ঘোষণা দিলেও প্রশ্ন রয়ে গেছে
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সরাসরি নির্বাচিত সরকারের ওপর এসেছে।
অক্টোবরে সংসদীয় দলের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চাঁদাবাজি ও জমি দখলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানান। তিনি সংসদ সদস্যদেরও জবাবদিহির আওতায় আনার কথা বলেছেন।
চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনারও জানিয়েছেন, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধের ঘটনায় মামলা ও গ্রেপ্তার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
তবে বিভিন্ন ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের পরিবর্তে শুধু দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার কিংবা কমিটি বিলুপ্ত করার মতো ব্যবস্থা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দলীয় সিদ্ধান্তের পাশাপাশি আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সহিংসতার চক্র ভাঙবে কীভাবে?
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এম. মনিরুজ্জামানের ২০০৯ সালের গবেষণায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতাকে একটি পুনরাবৃত্ত চক্র হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সংঘাত একে অন্যকে আরও সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দেয়। সরকার বিরোধীদের দমনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করলে বিরোধী পক্ষও আন্দোলন ও পাল্টা সংঘাতের পথ বেছে নেয়।
দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যেও বলপ্রয়োগকে দাবি আদায়ের স্বাভাবিক উপায় হিসেবে গ্রহণ করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এতে গণতান্ত্রিক সহনশীলতা, জবাবদিহি ও ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা দুর্বল হয়।
বাংলাদেশের গত দুই দশকের রাজনৈতিক ইতিহাস একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—শুধু সরকার পরিবর্তন করলেই সহিংসতার অবসান ঘটে না। জাতীয় ক্ষমতার পালাবদলের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যবসা, জমি, ঠিকাদারি ও দলীয় পদ নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতাও বন্ধ করতে হবে।
অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের প্রয়োগ, দলীয় সংগঠনের অভ্যন্তরে জবাবদিহি এবং স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা না গেলে রাজনৈতিক সহিংসতার এই চক্র ভাঙা কঠিন হবে। সরকার বদলালেও সহিংসতার চিত্র বদলাতে হলে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আনতে হবে।


