২৪ঘণ্টা - 24Ghonta

লোড হচ্ছে...

আন্তর্জাতিক

হিমালয়ে বড় দুর্যোগের শঙ্কা, ঝুঁকিতে ৩ লাখের বেশি মানুষ

গবেষণায় দেখা গেছে, উত্তর নেপাল, দক্ষিণ-পূর্ব তিব্বত এবং ভারতের উত্তরাখণ্ডের কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত বাড়ছে নির্মাণকাজ। ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এসব এলাকায় ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামোয় আচ্ছাদিত জমির পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ। আর হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের পানি উপচে বন্যার ঝুঁকি রয়েছে, এমন এলাকায় নির্মাণ বেড়েছে প্রায় ৭৮ শতাংশ।

২ নভেম্বর, ২০২৬ এ ২৩:৫৩
হিমালয়ে বড় দুর্যোগের শঙ্কা, ঝুঁকিতে ৩ লাখের বেশি মানুষ

২৪ঘন্টা অনলাইন: হিমালয় অঞ্চলে বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে রয়েছেন তিন লাখেরও বেশি মানুষ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমবাহ গলে যাওয়া, হ্রদের পানি বেড়ে যাওয়া এবং অপরিকল্পিত নির্মাণকাজের কারণে এসব এলাকায় দুর্যোগের আশঙ্কা বাড়ছে। নতুন এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। খবর বিবিসি বাংলা

গবেষণায় দেখা গেছে, উত্তর নেপাল, দক্ষিণ-পূর্ব তিব্বত এবং ভারতের উত্তরাখণ্ডের কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত বাড়ছে নির্মাণকাজ। ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এসব এলাকায় ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামোয় আচ্ছাদিত জমির পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ। আর হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের পানি উপচে বন্যার ঝুঁকি রয়েছে, এমন এলাকায় নির্মাণ বেড়েছে প্রায় ৭৮ শতাংশ। বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’-এ প্রকাশিত গবেষণাটি সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনার পর প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের ধারণা, বাস্তবে ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। কারণ, গবেষণায় হিমালয়ের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে; আশপাশের একই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

গবেষণায় ব্রিটেন, নেপাল ও ভারতের নয়জন বিজ্ঞানী হিমালয়ের নদীগুলোর দুই পাশের ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকা এবং প্রায় এক হাজার ৩৬০টি হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের আশপাশের অঞ্চল বিশ্লেষণ করেন। এতে পর্যটন অবকাঠামো, আবাসন, সড়ক ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের দ্রুত সম্প্রসারণের চিত্র উঠে এসেছে।

নেপালের পোখরা শহর এর একটি উদাহরণ। পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরটির বিস্তার ঘটেছে। কিন্তু শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সেতি গণ্ডকি নদীর তীরে গড়ে ওঠা পুরনো ভবনগুলো এখন বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। পোখরার মেয়র ধনরাজ আচার্য জানান, কিছু ভবন নদী থেকে মাত্র পাঁচ মিটার দূরে অবস্থিত।

নতুন নিয়মে নদী থেকে আরো দূরে ভবন নির্মাণের কথা থাকলেও পুরনো স্থাপনাগুলো কোথায় সরানো হবে, সেটিই বড় চ্যালেঞ্জ।পোখরার উত্তরে অন্নপূর্ণা ট্রেকিং এলাকাতেও নদীর তীরে বসতি ও পর্যটন স্থাপনা বেড়েছে। সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধসে এসব এলাকার কয়েকটি বসতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় হোমস্টে ব্যবসায়ী ফুরপা শিরিং লামা জানান, সাধারণত মৌসুমে তার ২০টি কক্ষ পর্যটকে পূর্ণ থাকলেও এবার অতিথি রয়েছেন মাত্র পাঁচটি কক্ষে। তার ভাষায়, ৪০ বছরের ব্যবসায়িক জীবনে এমন দুর্যোগ আগে দেখেননি। গবেষণার প্রধান লেখক ও লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ সি স্কট ওয়াটসন বলেন, নদী উপত্যকায় জনসংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে উন্নয়ন নিয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত আগামী কয়েক দশক ধরে এসব অঞ্চলের দুর্যোগঝুঁকিকে প্রভাবিত করবে।

জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে বিপর্যয়ের শঙ্কা

বিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্ব গড়ের তুলনায় হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা প্রায় দ্বিগুণ হারে বাড়ছে। এতে হিমবাহ, তুষারাবৃত ভূমি ও সারা বছর বরফে ঢাকা অঞ্চল দ্রুত গলে যাচ্ছে। ফলে পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে ভূমিধস, পাথরধস এবং আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। হিমবাহ গলে হ্রদের আয়তন বাড়ছে। একপর্যায়ে পানির অতিরিক্ত চাপ সামলাতে না পেরে এসব হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিতে পারে। নেপালে ১৯৪০ সাল থেকে এ ধরনের প্রায় ৩০টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া উঁচু পাহাড়ি এলাকায় বৃষ্টিপাত বাড়ায় ভূমিধসের ঝুঁকিও বাড়ছে।

গত আগস্টে নেপালে ভয়াবহ বন্যায় এক হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় এবং হাজারো মানুষ নিখোঁজ হন। পরে ১১ অক্টোবর বুধি গণ্ডকি নদীর বন্যায় প্রায় ২০০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, পাঁচটি সেতু ভেসে যায় এবং পাঁচজন নিখোঁজ হন। গবেষণায় নদী ও হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের পানির স্তর থেকে ৫০ মিটার উচ্চতার মধ্যে থাকা ভবনগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয়েছে। তবে ২৬ আগস্ট রাসুয়া জেলায় বন্যার সময় কোনো কোনো এলাকায় পানির উচ্চতা ৭০ মিটার পর্যন্ত উঠেছিল বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। ফলে গবেষণার হিসাবের বাইরেও অনেক স্থাপনা ঝুঁকিতে থাকতে পারে।

নির্মাণবিধি প্রয়োগে দুর্বলতা

নেপালের বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও নির্মাণবিধি যথাযথভাবে প্রয়োগ না করায় ঝুঁকি বাড়ছে। নদীর তীরবর্তী নিচু জমিতে হোটেল, বাজার, সড়ক ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে উঠছে। অনেক ক্ষেত্রে নদী থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার নিয়মও মানা হচ্ছে না।নেপালের জাতীয় দুর্যোগ সংস্থা জানিয়েছে, রাসুয়া-ভোটেকোশি এলাকায় নদীর তীর থেকে ১৫ মিটারের মধ্যে বসতি স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অন্য নদী উপত্যকায়ও একই ধরনের বিধিনিষেধ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

ভারতের উত্তরাখণ্ডেও পরিস্থিতি একই রকম। পরিবেশকর্মী অনুপ নওটিয়ালের অভিযোগ, পর্যটন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে নদীতীরবর্তী নির্মাণ নিয়ন্ত্রণের নিয়ম উপেক্ষা করা হচ্ছে। তবে বন্যাপ্রবণ এলাকায় জমির ব্যবহার ও নির্মাণ নিয়ন্ত্রণে গত ১২ অক্টোবর নতুন নিয়ম অনুমোদন করেছে উত্তরাখণ্ড সরকার।এদিকে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরে বলেন, সংকট সৃষ্টিতে নেপালের ভূমিকা না থাকলেও এর চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে দেশটিকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, কঠোর নির্মাণবিধি এবং ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী ভূমি ব্যবহারের পরিকল্পনা জরুরি। তবে হিমালয়ের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। তাই অপরিকল্পিত উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপদ এলাকায় বসতি গড়ে তোলাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

#জাতীয়#সংবাদ
শেয়ার করুন
আমাদের অনুসরণ করুন Facebook YouTube X Instagram