ভোট শেষের পরেই ব্যালট গণনা শুরু
২৪ঘণ্টা অনলাইন :

২৪ঘণ্টা অনলাইন : রাত পোহালেই নির্বাচন। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে নির্বাচন হবে ১২ ফেব্রুয়ারি। শেরপুর-৩ আসনে এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ভোট স্থগিত রয়েছে। একই সঙ্গে হবে জুলাই সনদ নিয়ে গণভোটও।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেড়ে যাওয়া গদিতে বসার দৌড়ে এখন দু’জন প্রতিদ্বন্ধী। ঘটনাচক্রে, দু’জনেই রহমান। প্রথম জন, সদ্যপ্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জ়িয়ার পুত্র সাবেক শাসকদল বিএনপির প্রধান তারেক রহমান। দ্বিতীয় জন মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কট্টরপন্থী ইসলামি সংগঠন জামাতে ইসলামীর (বাংলাদেশে যা ‘জামাত’ নামে পরিচিত) আমির শফিকুর রহমান।
প্রয়াত প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট হুসেন মহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি, গোটা চারেক বামপন্থী দল এবং ‘চরমোনাইর পীর’ নামে পরিচিত সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিমের ইসলামি আন্দোলন ভোটের লড়াইয়ে থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি জোট এবং জামাতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের মধ্যে। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ হবে। ভোটগ্রহণ হবে ব্যালট পেপারে। জাতীয় সংসদের নির্বাচনের জন্য সাদা এবং জুলাই সনদ নিয়ে গণভোটের জন্য রঙিন ব্যালট ব্যবহার করা হবে।
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫০টি নথিভুক্ত ও স্বীকৃতিপ্রাপ্ত রাজনৈতিক দল ভোটে লড়ছে। প্রার্থীর সংখ্যা ২,০২৮। তাঁদের মধ্যে মহিলা রয়েছেন ৮৩ জন। ২০ জন মহিলা কোনও দলের টিকিট ছাড়াই স্বতন্ত্রভাবে লড়ছেন। হাসিনার দল আওয়ামী লীগ ‘নিষিদ্ধ’ হওয়ায় ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পাচ্ছে না। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো গণভোটেও প্রবাসী, প্রবীণ-সহ চার শ্রেণির নাগরিকদের জন্য পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। ইতিমধ্যেই সে পর্ব শুরু হয়ে গিয়েছে।
কোন পথে ভোট বাংলাদেশে
গত ১১ ডিসেম্বর মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসিরউদ্দিন ঘোষণা করেছিলেন, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন হবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন একই সঙ্গে হবে জুলাই সনদ নিয়ে গণভোটও। কমিশনের ঘোষণা মতোই গত ১২ থেকে ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত মনোনয়ন জমা নেওয়া হয়েছে। ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি হয়েছে মনোনয়ন পরীক্ষার কাজ। মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্তগুলির বিরুদ্ধে ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত আপিল করেছেন বাদ পড়া প্রার্থীরা। ১২-১৮ জানুয়ারি হয়েছে সেই আপিলগুলির যথার্থতা যাচাইয়ের কাজ। চূড়ান্ত প্রার্থিতালিকা প্রকাশ এবং নির্বাচনী প্রতীক নির্ধারণ করা হয়েছে ২১ জানুয়ারি। আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারের পালা চলেছে ২২ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। বৃহস্পতিবার হবে জোড়া ভোট।
কী রয়েছে গণভোটে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি বৃহস্পতিবার একই সঙ্গে জুলাই সনদ নিয়ে গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে বাংলাদেশে। গত নভেম্বরে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ অনুযায়ী চারটি বিষয়ের উপর একটি প্রশ্নের ভিত্তিতে হবে ওই গণভোট। সেগুলো হচ্ছে—
১. নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে গঠন করা হবে।
২. আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
৩. সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকার-সহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলি ঐকমত্য হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দল বা জোট বাধ্য থাকবে।
৪. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।
ফিরে দেখা ইতিহাস
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে অনুঘটক করে শুরু হওয়া গণবিক্ষোভের জেরে ২০২৪ সালে ৫ আগস্ট পতন ঘটেছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের। হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। ক্ষমতার বসেছিল নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। ইউনূসের জমানায় ফাঁসির সাজা হয়েছে হাসিনার। গত বছরের ৫ আগস্ট ইউনূস ‘জুলাই ৩৬ উদ্যাপন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ও পাঠ করেছিলেন। ২৮ দফার ওই ঘোষণাপত্র হল ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের একটি দলিল, যার মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। মুজিবুর রহমান এবং হাসিনার আমলে ‘আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারের’ পাশাপাশি ওই সনদে সমালোচনা করা হয়েছে দুই সেনাশাসক, জিয়াউর রহমান (বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা) এবং হুসেন মহম্মদ এরশাদের (জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা) জমানারও। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের ‘জাতীয় বীর’ হিসাবে ঘোষণার প্রস্তাবও রয়েছে ওই সনদে। তা নিয়েই হবে গণভোট। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জানিয়েছেন, দলীয় প্রতীকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে নিবন্ধিত ৫৬টি রাজনৈতিক দল। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত রয়েছে।
কী বলছে জনমত সমীক্ষা?
অধিকাংশ জনমত সমীক্ষা রিপোর্টেই এগিয়ে রাখা হয়েছে বিএনপি জোটকে। তাৎপর্যপূর্ণভাবে ১০ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত একটি রিপোর্টে ভোটদানের হারের উপর জয়-পরাজয়ের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ (বিআইডিডি) প্রকাশিত ওই জনমত সমীক্ষা রিপোর্টে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৬৫ থেকে ৬৮ শতাংশ ভোট পড়লে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির জোট একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে। আর ভোটদানের হার যদি ৫৩ থেকে ৫৮ শতাংশ হয় শফিকুর রহমানের জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ‘নির্বাচনী ঐক্যে’র সরকার গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হবে।
বিআইডিডি-র জনমত সমীক্ষকদের দাবি, কট্টর ইসলামপন্থী দল জামাতের ভোটারেরা তুলনামূলকভাবে ‘সংগঠিত’ এবং আদর্শগত আনুগত্যে অবিচল। ভোটদানের হার কম হলে তা হলে জামাতের সংগঠিত সমর্থনের সূচক। অন্যদিকে, সদ্যপ্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার দল বিএনপির ভোটারেরা তুলনায় অনেকটাই অসংগঠিত। ফলে বেশি ভোটদানের ইঙ্গিত হল, সাধারণ ভোটারদের বুথমুখী হওয়ার প্রবণতাবৃদ্ধি। যা বিএনপির পক্ষে লাভজনক হওয়ার সম্ভাবনা।
আনকভারিং দ্য পাবলিক পালস: ফাইন্ডিংস ফ্রম আ নেশনওয়াইড সার্ভে’ শীর্ষক জনমত সমীক্ষার দাবি, ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিলেন, এমন ৪৮.২ শতাংশ ভোটার এবার বিএনপিকে ভোট দেবেন। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তি জামায়াতে ইসলামী পেতে পারে ২৯.৯ শতাংশ আওয়ামী লীগ ভোটারের সমর্থন। তবে ভারতীয় উপমহাদেশে অতীতে অনেক নির্বাচনেই জনমত সমীক্ষা ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
