পরমাণু বোমার বিস্ফোরণের পরও আপনি প্রাণে বাঁচবেন

২৪ঘণ্টা অনলাইন : পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ! জানেন কি, ঠিক কত দূরে থাকলে আপনি প্রাণে বেঁচে যাবেন?ফাইল ছবি
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: আগামী মাসে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পরমাণু হামলার ৮০ বছর পূর্ণ হবে। এই বিস্ফোরণের ফলে ২ লক্ষেরও বেশি মানুষ, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন সাধারণ নাগরিক, যারা প্রাণ হারান। বহু বেঁচে যাওয়া মানুষ দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যায় ভোগেন। এখনও পর্যন্ত যুদ্ধের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত একমাত্র পরমাণু অস্ত্র হামলা (Nuclear Blast)। তবে বাস্তবতা হল, ২০২৫ সালের শুরু পর্যন্ত বিশ্বে ১২,২০০টিরও বেশি পরমাণু ওয়ারহেড বিদ্যমান।
এখনকার সময়ে যদি পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটে তাহলে আপনি সেফ তো? সাধারণভাবে বললে, একটি পারমাণবিক বিস্ফোরণের কিছু পূর্বানুমানযোগ্য ধাপ থাকে, যার কারণে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকতেও পারে। পরমাণু বিস্ফোরণের প্রায় ৩৫ শতাংশ তাপ বিকিরণ হয়। যেহেতু তাপ বিকিরণ আলোর গতিতে ছড়ায়, তাই বিস্ফোরণের সময় প্রথমেই যে জিনিসটি মানুষকে আঘাত করে তা হল এক ঝলক অন্ধকার করে দেওয়া আলো ও তীব্র তাপ।
এই আলো চোখে অস্থায়ী অন্ধত্ব ঘটাতে পারে– যাকে ফ্ল্যাশ ব্লাইন্ডনেস বলা হয়, যা কয়েক মিনিট স্থায়ী হতে পারে। ১ মেগাটন শক্তির পরমাণু বোমা, যা হিরোশিমায় ফেলা বোমার চেয়ে ৮০ গুণ শক্তিশালী, যদিও অনেক আধুনিক পারমাণবিক অস্ত্রের তুলনায় এটি তুলনামূলকভাবে ছোট। এই ধরনের বিস্ফোরণের ক্ষেত্রে, ২১ কিমি (১৩ মাইল) দূরত্ব পর্যন্ত মানুষ ফ্ল্যাশ ব্লাইন্ডনেসে ভুগতে পারে এবং রাতে এই দূরত্ব হতে পারে ৮৫ কিমি পর্যন্ত। তাপের প্রভাব বিস্ফোরণস্থলের কাছাকাছি থাকা ব্যক্তিদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। হালকা বা ফার্স্ট ডিগ্রি বার্ন ১১ কিমি দূর পর্যন্ত হতে পারে। থার্ড ডিগ্রির পোড়া, যা চামড়া সম্পূর্ণ শেষ করে দেয় ও ফোস্কা ফেলে- ৮ কিমি দূরত্ব পর্যন্ত যে কাউকে প্রভাবিত করতে পারে।
শরীরের ২৪ শতাংশের বেশি অংশ যদি থার্ড-ডিগ্রি পুড়ে যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা না মেলে, তা হলে মৃত্যুঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।
তবে আপনি কী পরেছেন তার উপরও নির্ভর করে – সাদা পোশাক কিছুটা বিকিরণ প্রতিফলিত করতে পারে, আর গায়ে গাঢ় রঙের পোশাক তা বেশি শোষণ করে। তবে যারা বিস্ফোরণের খুব কাছাকাছি রয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে এই পার্থক্যগুলো তেমন কাজে আসে না। ১ মেগাটন বোমার কেন্দ্রস্থলে তাপমাত্রা ১০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে – যা সূর্যের কেন্দ্রীয় তাপমাত্রার প্রায় পাঁচ গুণ! এ ধরনের তাপমাত্রা মুহূর্তের মধ্যেই মানবদেহকে মূল মৌলিক উপাদানে, যেমন কার্বনে, রূপান্তর করে দিতে পারে।
বিস্ফোরণকেন্দ্র থেকে কিছুটা দূরে যারা থাকবেন, তাদের ক্ষেত্রে শুধু তাপ নয়, বিস্ফোরণের তরঙ্গ ও বায়ুচাপের মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। বিস্ফোরণের ফলে আশপাশের বাতাস সরে যায়, এবং এক বিশাল চাপে সবকিছুকে চূর্ণ করে দেয়। তত্ত্ব অনুযায়ী, মানবদেহ এমন চাপ সহ্য করতে পারে, কিন্তু বাস্তবে বেশিরভাগ মানুষ ধসে পড়া ভবনের নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারাবে। চাপ হবে চার গুণ বেশি, বাতাসের গতি পৌঁছাবে ৭৫৬ কিমি প্রতি ঘণ্টায়। এত সব থেকে বেঁচে গেলেও, রেডিয়েশন পয়জনিং বা বিকিরণজনিত বিষক্রিয়া থেকে রক্ষা পাওয়া কঠিন।
হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে যে বিস্ফোরণ হয়েছিল, সেগুলো ছিল air burst – অর্থাৎ বোমা শহরের কয়েকশো মিটার ওপরে বিস্ফোরিত হয়েছিল। যদি তা মাটির সমতলে বিস্ফোরিত হত, তাহলে মাটির ধূলিকণাও ব্যাপকভাবে বিকিরণে আক্রান্ত হয়ে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ত। nuclear fallout-এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পৃথিবীর জন্য ভয়ঙ্কর হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ সালের এক সিমুলেশন গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যদি আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যে একটি পরমাণু যুদ্ধ হয়, তাহলে তার ফলে পৃথিবী কয়েক দিনের মধ্যেই nuclear winter-এ ঢুকে পড়বে – বাতাসে ছড়িয়ে পড়া ধোঁয়া ও ছাই সূর্যের আলো আটকে দেবে।
এমনকি, বিকিরণকণাগুলো খুব দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে। এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ঠান্ডা যুদ্ধের সময় পরমাণু বোমা পরীক্ষার রেডিওঅ্যাকটিভ কার্বনের চিহ্ন পর্যন্ত পাওয়া গিয়েছে মারিয়ানা ট্রেঞ্চে – পৃথিবীর গভীরতম সমুদ্রতলে। তবে এসব এখনও শুধুই কাল্পনিক। বিশ্বের নানা আন্তর্জাতিক চুক্তি পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার ও ব্যবহারের বিরুদ্ধে সক্রিয় রয়েছে।
