নানির পাশে চিরনিদ্রায় সেনাসদস্য তিতাস
টেকনাফে মানবপাচারবিরোধী অভিযানে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত সেনাসদস্য তিতাস শেখকে ফরিদপুরের নগরকান্দায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়েছে। শুক্রবার সামরিক হেলিকপ্টারে তার মরদেহ জন্মভূমিতে আনা হয়। জানাজা শেষে নানির কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। তিতাসের বাবা অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য এবং ছোট ভাইও সেনাবাহিনীতে কর্মরত। আগামী ডিসেম্বরে স্ত্রীকে কর্মস্থলে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার।

ছবি : ছবি : সংগৃহীত২৪ঘন্টা অনলাইন: ২৪ঘন্টা অনলাইন : বাবা অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য, ছোট ভাইও কর্মরত সেনাবাহিনীতে। দেশের সেবায় নিয়োজিত সেই পরিবারের বড় সন্তান তিতাস শেখ ফিরলেন নিথর দেহে। সামরিক হেলিকপ্টারে জন্মভূমিতে আনার পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়েছে তাকে।
ফরিদপুরের নগরকান্দায় শেষ হলো সেনাসদস্য তিতাস শেখের (২৭) জীবনের শেষ অধ্যায়। টেকনাফে মানবপাচারবিরোধী অভিযানে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত এই সেনাসদস্যকে শুক্রবার সন্ধ্যায় লস্করদিয়া পশ্চিমপাড়া কবরস্থানে নানির কবরের পাশে দাফন করা হয়েছে। তার শেষ বিদায়ে শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো এলাকায়।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বিকেল ৫টার দিকে সেনাবাহিনীর বিশেষ হেলিকপ্টারে তিতাসের মরদেহ নগরকান্দার মহেন্দ্র নারায়ণ একাডেমি মাঠে পৌঁছায়। পদ্মা সেনানিবাস ক্যাম্পের ১৫ আরই রিভারাইন ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক মেজর সোহেল আহমেদের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি দল মরদেহ গ্রহণ করে।
পরে মরদেহ নেওয়া হয় লস্করদিয়া আতিকুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে। সেখানে সন্তানের কফিনবন্দী মরদেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা আফজাল শেখ ও মা রেখা বেগম। অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য বাবার সামনে তখন নিথর হয়ে শুয়ে আছেন তারই সন্তান—যিনি দেশের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।
বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে মরদেহ কবরস্থানে নেওয়ার পথে বাড়ির পাশের একটি মোড়ে স্বজনদের শেষবারের মতো দেখার জন্য রাখা হয়। সেখানে স্ত্রী, বাবা-মা ও আত্মীয়দের আহাজারিতে এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা আফরিন, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম সামদানি আজাদ, সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
সন্ধ্যা ৭টার দিকে লস্করদিয়া পশ্চিমপাড়া কবরস্থানে নানির কবরের পাশে তিতাসকে সমাহিত করা হয়। দাফনের পর সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের পর সাতজন সেনাসদস্য তিন দফায় মোট ২১টি ফাঁকা গুলি ছুড়ে তাকে সামরিক মর্যাদায় শেষ বিদায় জানান।
জানাজার আগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা আফরিন বলেন, দেশের দায়িত্ব পালনে সাহসিকতার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে জীবন দিয়েছেন তিতাস শেখ। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং মানবপাচারকারীদের মতো অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে অভিযানে তার আত্মত্যাগ জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।
জানাজায় আরও বক্তব্য দেন তিতাসের মামা ও লস্করদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাবুল তালুকদার, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) খায়রুল হাসানসহ স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
পরিবারের তিনজনই সেনাসদস্য
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগ দেন তিতাস। তিনি সেনাবাহিনীর ১ বীর ইউনিটের সদস্য হিসেবে টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে দায়িত্ব পালন করছিলেন। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়।
তিতাসের বাবা আফজাল শেখ সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়েছেন। ছোট ভাই আকরাম হোসেনও বর্তমানে সেনাবাহিনীতে কর্মরত। অর্থাৎ একই পরিবারের তিন সদস্য দেশের সেবায় যুক্ত ছিলেন।
চার বছর আগে পাশের গ্রামের সুমাইয়া আক্তারকে বিয়ে করেন তিতাস। আগামী ডিসেম্বর মাসে স্ত্রীকে নিজের কর্মস্থলে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। স্বামীর সঙ্গে কর্মস্থলে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা স্ত্রীকে এখন কাটাতে হবে দীর্ঘ বিচ্ছেদের সময়।
অভিযানে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে টেকনাফে মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে যৌথবাহিনীর অভিযান চলছিল। এ সময় পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের গুলিতে বুকের বাঁ পাশে বিদ্ধ হন তিতাস শেখ। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে রামু সিএমএইচে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
দেশের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারানো এই তরুণ সেনাসদস্যের মৃত্যুতে শোকাহত পরিবার, সহকর্মী ও এলাকাবাসী। ডিসেম্বরের একটি পারিবারিক পরিকল্পনা থেকে শুরু করে জীবনের বহু স্বপ্ন—সবই থেমে গেল টেকনাফের সেই অভিযানে ছোড়া একটি গুলিতে।


