ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিতে উপকূল, বিপর্যস্ত জনজীবন ও অর্থনীতি
জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীভাঙন ও দুর্বল বেড়িবাঁধের কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বাড়ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষিজমি, মাছের ঘের, বসতবাড়ি ও স্থানীয় অর্থনীতি।

২৪ঘন্টা অনলাইন: ২৪ঘণ্টা অনলাইন : জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীভাঙন ও উপকূলীয় দুর্বল অবকাঠামোর কারণে বাড়ছে দুর্যোগের অভিঘাত। ঝুঁকিতে লাখো মানুষের বসতি, কৃষিজমি, মৎস্যসম্পদ ও জীবিকা।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ঝড়, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি ক্রমেই বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে উপকূলজুড়ে আঘাত হানছে প্রবল বাতাস, অস্বাভাবিক জলোচ্ছ্বাস ও ভারী বৃষ্টিপাত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদ-নদীর নাব্যতা হ্রাস, উপকূলীয় নদীর ভাঙন এবং লবণাক্ততার বিস্তার। ফলে উপকূলের মানুষের জীবনযাত্রা, কৃষি, মৎস্যসম্পদ, যোগাযোগব্যবস্থা ও সামগ্রিক অর্থনীতি ক্রমেই অধিক ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
বিশেষ করে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার বিস্তীর্ণ উপকূলীয় জনপদে প্রাকৃতিক দুর্যোগের অভিঘাত বহুমাত্রিক। কোনো এলাকায় নদীভাঙনে বসতভিটা বিলীন হচ্ছে, কোথাও জলোচ্ছ্বাসের পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে ফসলের মাঠ, আবার কোথাও লবণাক্ত পানির কারণে সুপেয় পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। দুর্যোগের তাৎক্ষণিক ক্ষতির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটও গভীর হচ্ছে।
ঝুঁকি বাড়াচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন
উপকূলীয় অঞ্চলে দুর্যোগের ঝুঁকি বৃদ্ধির পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। একই সঙ্গে সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা, বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা ও আবহাওয়ার ধরনে পরিবর্তন ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বাড়াতে পারে।
ঘূর্ণিঝড়ের সময় স্বাভাবিক জোয়ারের সঙ্গে ঝড়ের প্রভাবে সৃষ্ট পানির উচ্চতা যুক্ত হলে জলোচ্ছ্বাস ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে নিম্নাঞ্চল, চরাঞ্চল ও নদীর মোহনায় বসবাসকারী মানুষের জন্য এ পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক। বেড়িবাঁধ দুর্বল থাকলে কিংবা কোথাও বাঁধ ভেঙে গেলে মুহূর্তেই লোকালয়ে পানি ঢুকে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হতে পারে।
উপকূলের অনেক এলাকায় বসতি, কৃষিজমি ও মাছের ঘের নদী বা সমুদ্রের কাছাকাছি হওয়ায় সামান্য পানি বৃদ্ধিতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। ফলে দুর্যোগ মোকাবিলায় শুধু আগাম সতর্কতা নয়, দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি।
কৃষিতে লবণাক্ততার আঘাত, হুমকিতে খাদ্যনিরাপত্তা
উপকূলীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি কৃষি। কিন্তু ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে কৃষিজমিতে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করায় ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে আমন ধান, শীতকালীন সবজি, ডাল ও অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদনে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
জলোচ্ছ্বাসের পানি একবার জমিতে ঢুকলে অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন মাটিতে লবণাক্ততার প্রভাব থেকে যায়। এতে বীজের অঙ্কুরোদ্গম, গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যায় না। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে ধান ও সবজি চাষের পরিবর্তে চিংড়ি বা লবণসহিষ্ণু ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের এক মূল্যায়নে বাংলাদেশের উপকূলীয় ২৫০টি গ্রামের মানুষের কাছে জলবায়ু অভিযোজনের সবচেয়ে জরুরি অপূর্ণ চাহিদা হিসেবে জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামোর বিষয়টি উঠে এসেছে। একই মূল্যায়নে উপকূলের বহু পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সীমাবদ্ধতাকে অভিযোজনের বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। World Bank
এ পরিস্থিতি শুধু কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগজনক। কারণ উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন কমে গেলে স্থানীয় বাজারে খাদ্য সরবরাহ, কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়ে।
মৎস্যসম্পদ ও ঘেরের অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা
উপকূলের লাখো মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নদী, সাগর, মাছ ধরা, চিংড়ি চাষ ও জলজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে মাছের ঘেরের বাঁধ ভেঙে গেলে চাষ করা মাছ ও চিংড়ি ভেসে যায়। লবণাক্ত পানির আকস্মিক পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি এবং পানির গুণগত অবনতিও মাছের উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ এলাকায় চিংড়ি চাষ গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি ঘূর্ণিঝড় বা অস্বাভাবিক জলোচ্ছ্বাসে ঘেরের অবকাঠামো নষ্ট হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি চাষিরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। অনেক সময় ধারদেনা করে নতুন করে উৎপাদন শুরু করতে হয়।
সমুদ্রগামী জেলেদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি। বৈরী আবহাওয়ায় মাছ ধরতে না পারলে আয় বন্ধ থাকে। ঝড়ের সংকেতে সমুদ্রে থাকা নৌযান নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরতে বাধ্য হয়। আবার নদী ও সাগরে দুর্যোগের কবলে পড়ে প্রাণহানি, নিখোঁজ হওয়া এবং নৌযান হারানোর ঘটনাও ঘটে।
২০২৪ সালের ঘূর্ণিঝড় রিমালের পর জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা পরিকল্পনায় ৬২ হাজার ৭৮৩ হেক্টরের বেশি কৃষিজমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। এতে ৫ লাখ ৩৭ হাজার ২৩৪ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন। ক্ষতির শিকার হয় মৎস্য, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি ও অন্যান্য জীবিকাও। MARCH 2025
বেড়িবাঁধ দুর্বল, আতঙ্কে নদীতীরের মানুষ
উপকূলীয় জনপদ রক্ষায় বেড়িবাঁধ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা অবকাঠামোগুলোর একটি। কিন্তু অনেক এলাকায় বাঁধের উচ্চতা, নির্মাণমান, রক্ষণাবেক্ষণ ও নদীভাঙন মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কোথাও বাঁধে ফাটল দেখা দেয়, কোথাও নদীর তীব্র স্রোতে মাটি ধসে পড়ে। আবার কোথাও দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ঘূর্ণিঝড়ের সময় এসব দুর্বলতা ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। একটি বাঁধ ভেঙে গেলে শুধু কয়েকটি বাড়িঘর নয়, পুরো ইউনিয়নের কৃষিজমি, মাছের ঘের, রাস্তাঘাট ও জনবসতি প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের বিভিন্ন নদীতীরবর্তী এলাকায় নদীভাঙন ও লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ দীর্ঘদিনের সমস্যা। বিশেষ করে সুন্দরবনসংলগ্ন জনপদে নদী ও জোয়ারের পানির সঙ্গে মানুষের বসতি ও জীবিকার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। দুর্যোগের অভিঘাতে এসব এলাকার মানুষের পুনর্বাসন ও জীবিকা পুনর্গঠন কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশ্বব্যাংকের উপকূলীয় সুরক্ষা কর্মসূচিতে বেড়িবাঁধ উন্নয়ন, পোল্ডার সংস্কার, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। World Bank +1
সুপেয় পানির সংকট ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি
উপকূলীয় অঞ্চলে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের আরেকটি বড় ক্ষতি হলো সুপেয় পানির সংকট। জলোচ্ছ্বাসের লবণাক্ত পানি পুকুর, জলাধার ও কখনো কখনো পানির উৎস দূষিত করে। এতে খাবার পানি সংগ্রহ করতে মানুষকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়।
বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্কদের ওপর এর প্রভাব বেশি পড়ে। দূষিত পানি ব্যবহারের কারণে ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ পানিবাহিত বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ে। দুর্যোগের পর স্বাস্থ্যসেবা, ওষুধ ও নিরাপদ পানির সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাঁচ উপকূলীয় জেলা—বাগেরহাট, বরগুনা, খুলনা, পিরোজপুর ও সাতক্ষীরায় প্রায় ৯০ লাখ মানুষ উচ্চমাত্রার পানি ও মাটির লবণাক্ততায় আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। Scientific Reports
অর্থাৎ উপকূলের সংকট কেবল ঝড়ের সময়ের নয়; দুর্যোগের পরও দীর্ঘদিন মানুষকে এর প্রভাব বহন করতে হয়।
সুন্দরবন: প্রাকৃতিক ঢালও ঝুঁকির মুখে
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলকে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সরাসরি আঘাত থেকে রক্ষায় সুন্দরবনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিস্তীর্ণ ম্যানগ্রোভ বন ঝড়ের বাতাসের গতি ও ঢেউয়ের শক্তি কমাতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে এটি উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে।
কিন্তু ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততার পরিবর্তন, নদীভাঙন, দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রও চাপের মুখে পড়ছে। বনের নদী-খাল, মাছ, বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদসম্পদের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়লে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বননির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকাও।
সুন্দরবনকে রক্ষা করা তাই শুধু পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয় নয়; এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনবসতি, অর্থনীতি ও দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা রক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান
প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব শুধু কৃষি কিংবা মৎস্য খাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। উপকূলীয় অঞ্চলের ক্ষুদ্র ব্যবসা, পরিবহন, হাটবাজার, পর্যটন, নৌযান চলাচল এবং স্থানীয় কর্মসংস্থানও ক্ষতির মুখে পড়ছে।
ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হয়। বাজারে কৃষিপণ্য ও মাছের সরবরাহ কমে যায়। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হলে আয় বন্ধ হয়ে যায় অনেক পরিবারের। দিনমজুর, জেলে, কৃষিশ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়েন।
বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন মূল্যায়নে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বাংলাদেশে বছরে গড়ে প্রায় ১০০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। World Bank +1
দুর্যোগের পর ঘরবাড়ি মেরামত, কৃষিকাজ পুনরায় শুরু, মাছের ঘের সংস্কার এবং ব্যবসা চালু করতে প্রয়োজন হয় অতিরিক্ত অর্থ। দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য এই ব্যয় বহন করা কঠিন। ফলে অনেক পরিবার ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কেউ কেউ জীবিকার সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হতেও বাধ্য হন।
বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কা বাড়ছে
উপকূলীয় অঞ্চলে নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও বারবার দুর্যোগের কারণে মানুষের বসবাসের পরিবেশ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। ঘূর্ণিঝড়ে ঘরবাড়ি হারানো কিংবা নদীভাঙনে জমি বিলীন হওয়ার পর অনেক পরিবার আর আগের জায়গায় ফিরে যেতে পারে না।
বিশেষ করে দরিদ্র কৃষক, ভূমিহীন শ্রমজীবী ও জেলে পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের সুযোগ সীমিত। কাজের সন্ধানে তাদের কেউ শহরে, কেউ অন্য জেলায় চলে যাচ্ছেন। এতে শহরাঞ্চলে জনসংখ্যার চাপ বাড়ার পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলে শ্রমশক্তি ও সামাজিক কাঠামোয় পরিবর্তন ঘটছে।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বাস্তুচ্যুতি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অন্যতম বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিরোধে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
উপকূলীয় অঞ্চলের ঝুঁকি মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন প্রকল্প বা সাময়িক সংস্কার যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
প্রথমত, ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ চিহ্নিত করে টেকসইভাবে সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করতে হবে। বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য জলোচ্ছ্বাস, নদীর গতিপথ ও পানির উচ্চতা বিবেচনায় নিতে হবে। শুধু নির্মাণ নয়, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারিও নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পর্যাপ্ত ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে। আশ্রয়কেন্দ্রে নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও বয়স্কদের জন্য বিশেষ সুবিধা এবং গবাদিপশু রাখার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। দুর্যোগের আগাম বার্তা দ্রুত প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও আরও কার্যকর করতে হবে।
তৃতীয়ত, কৃষিতে জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তি সম্প্রসারণ জরুরি। লবণসহিষ্ণু ধানের জাত, বিকল্প ফসল, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, মিঠাপানির জলাধার এবং উন্নত সেচব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, কৃষি উপকরণ ও ফসলের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
চতুর্থত, মৎস্য ও চিংড়ি খাতকে দুর্যোগসহনশীল করতে হবে। ঘেরের বাঁধ শক্তিশালী করা, নিরাপদ নৌযান, আবহাওয়ার আগাম তথ্য এবং দুর্যোগ-পরবর্তী আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
পঞ্চমত, সুন্দরবনসহ উপকূলীয় প্রাকৃতিক প্রতিবেশ রক্ষায় বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। নদী-খাল পুনঃখনন, ম্যানগ্রোভ বনায়ন, প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ এবং উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী সম্প্রসারণ করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উপকূলের মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো পরিকল্পনাই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা, প্রয়োজন ও বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
উপকূল রক্ষা মানেই দেশের ভবিষ্যৎ রক্ষা
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল শুধু একটি ভৌগোলিক সীমান্ত নয়; এটি দেশের খাদ্য উৎপাদন, মৎস্যসম্পদ, বৈদেশিক আয়, জীববৈচিত্র্য ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এ অঞ্চলের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাই জাতীয় উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পুরোপুরি বন্ধ করা বাংলাদেশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে পরিকল্পিত অভিযোজন, টেকসই অবকাঠামো, কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
উপকূলের মানুষ প্রতিবার ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের পর নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু শুধু মানুষের সহনশীলতার ওপর নির্ভর করে এই সংকট মোকাবিলা করা যাবে না। রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ, কার্যকর নীতি, স্থানীয় প্রশাসনের জবাবদিহি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অপরিহার্য।
আজ যে বেড়িবাঁধ ভাঙছে, যে কৃষিজমি লবণাক্ত হচ্ছে, যে পরিবার বসতভিটা হারাচ্ছে—তা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এগুলো ভবিষ্যতের আরও বড় বিপর্যয়ের সতর্কবার্তা।
এখনই উপকূল সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এর মূল্য দিতে হবে আরও বেশি মানুষকে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে জাতীয় অর্থনীতি এবং বাধাগ্রস্ত হবে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন। উপকূলকে বাঁচানো তাই এখন আর শুধু পরিবেশগত দায়িত্ব নয়, এটি বাংলাদেশের অস্তিত্ব, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থ রক্ষার প্রশ্ন।
