রাজু, কেন এভাবে চলে গেলে

আরিফ সোহেল : ক্রীড়া সাংবাদিক রাজু আহমেদ আর নেই (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৪১ বছর। তার আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবার-পরিজন, সহকর্মী ও পুরো সাংবাদিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
৯ মার্চ ২০২৬; এই তারিখটি যেন হঠাৎ করেই থামিয়ে দিল বহু গল্প, বহু স্মৃতি। দুপুর দুইটা পর্যন্ত যে মানুষটির সঙ্গে গল্পের শেষ ছিল না, মুহূর্তের ব্যবধানে তিনি পাড়ি জমালেন অনন্তের পথে। প্রিয়জনদের কাছে তিনি শুধু রাজু নন; পরিবারের কাছে রাসেল, বন্ধুদের কাছে প্রাণখোলা এক মানুষ, আর সহকর্মীদের কাছে নিবেদিতপ্রাণ এক ক্রীড়া সাংবাদিক।
রাজুর পারিবারিক নাম ছিল রাসেল। আত্মীয়তার সূত্রে রাজু আমার খালাতো ভাই। সংবাদপত্রের জগতে তার যাত্রার শুরুটা হয়েছিল আমার হাত ধরেই। প্রায় ১৫ বছর আগে হুট করেই রাজু বিয়ে করেছিল। ওর চোখে-মুখে বেকারত্বের বিপদ দেখেছিল লিপি [আমার সহধর্মীনী]। লিপিই বলেছিল রাসেলকে তোমার সাথে নিয়ে নাও। আমি নিমরাজি ছিলাম। ওকে কাজ শিখাতে খুব সময় লাগেনি। খেলাটা ওর মন-দেহ-প্রাণে লেগেছিল। বিশেষ করে ক্রিকেট। খেলা জানতো-পারতো বলেই মাস না পেরুতেই রির্পোটিংটা প্রায় হয়ে গেল। ভাষায় ধারটাও মন্দ ছিল না। শুরুতে মনে দ্বিধা ছিল— পারবে তো? কিন্তু খুব অল্প সময়েই রাজু প্রমাণ করে দেয়, সে পারবে। নিজের যোগ্যতা, নিষ্ঠা আর ভালোবাসা দিয়ে সাংবাদিকতার জগতে দ্রুতই জায়গা করে নেয় সে।
স্পোর্টস সাংবাদিকতায় রাজুর ছিল এক বিশেষ দক্ষতা। অনেক সময় নিজেই ছিলেন বিভাগের প্রধান, আবার নিজেই রিপোর্টার। নিজের হাতে সাজাতেন পুরো স্পোর্টস পেজ। বিশেষ করে ক্রিকেট নিয়ে তার লেখা ছিল পাঠকদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়। শব্দের নান্দনিক ব্যবহারে তিনি ক্রিকেটকে তুলে ধরতেন এক অনন্য শৈলীতে।
শুধু লেখাই নয়, রাজুর ব্যক্তিত্বও ছিল সবার মনকাড়া। নম্র আচরণ, মিষ্টি হাসি আর আন্তরিকতা দিয়ে তিনি সহকর্মীদের মন জয় করেছিলেন সহজেই। আশেপাশে প্রায়ই তাঁর কাজের প্রশংসা শুনতাম; সেসব গল্প শুনে বুক ভরে যেত গর্বে। বড় পত্রিকায় কাজ না করলেও তার লেখার পাঠক ও ভক্তের সংখ্যা ছিল অনেক। প্রতিনিয়ত যেন নিজের সীমা ছাড়িয়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে চাইতেন তিনি।
২০২২ সালে বাবার অকাল মৃত্যু রাজুর জীবনে বড় এক মোড় এনে দেয়। আর্মিম্যান লোকমান হোসেন— রাজুর শ্রদ্ধেয় পিতা ১১ জুন ২০২২ সালে পরিবারকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে বিদায় নেন। সেই সময় রাজু যেন ভিতরে ভিতরে বদলে যেতে শুরু করে। বাবাহীন সংসারে মাকে একা রেখে শহুরে জীবন তার কাছে অসহ্য মনে হতে থাকে।
প্রায় প্রতি সপ্তাহেই ঢাকায় কাজের ফাঁকে বাইক চালিয়ে ছুটে যেত টাঙ্গাইলের গ্রামের বাড়ি। ক্লান্তি যেন তাকে স্পর্শ করত না। কিন্তু রাজুর মা গ্রামের বাড়ি ছাড়তে রাজি হননি। অনেক চেষ্টা করেও মাকে ঢাকায় আনতে না পেরে শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালে রাজু ঢাকার চাকরি ছেড়ে গ্রামের বাড়িতেই ফিরে যায়।
টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার মৌসামুরার ভাতগ্রামে মায়ের পাশে থেকে শুরু করে ফার্মেসি ব্যবসা। মনে হচ্ছিল জীবনের নতুন এক শান্ত অধ্যায় শুরু হয়েছে। কিন্তু নিয়তির লিখন যেন অন্য কিছুই ছিল।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ৯ মার্চ সকাল থেকেই রাজু শারীরিক অস্বস্তি অনুভব করছিলেন। প্রথমে ভেবেছিলেন গ্যাসজনিত সমস্যা। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসকের পরামর্শে কিছু ওষুধও খান। কিন্তু বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুকের ব্যথা তীব্র হতে থাকে।
দুপুর দেড়টার দিকে তিনি আশপাশের লোকজনকে বলেন তাকে কুমুদিনী হাসপাতালে নিয়ে যেতে। কিন্তু এর আগেই নিজের ফার্মেসি দোকানেই হঠাৎ লুটিয়ে পড়েন। স্থানীয়রা দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে বিকেল আনুমানিক চারটার দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
রাজুর বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার মৌসামুরার ভাতগ্রামে। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, রাতেই নামাজে জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
রাজু আহমেদ রাসেল দীর্ঘদিন ধরে ক্রীড়া সাংবাদিকতায় নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করেছেন। কর্মজীবনে তিনি দৈনিক ডেসটিনি, যায়যায়দিন এবং সর্বশেষ সময়ের আলো পত্রিকায় কাজ করেছেন। তার পেশাগত দক্ষতা ও আন্তরিকতা দিয়ে সহকর্মী ও পাঠকদের আস্থা অর্জন করেছিলেন। রাজুকে নিয়ে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় কৃতজ্ঞতা কথা আজ প্রকাশ করতে চাই। রাজু আমার ছেলে অনিন্দ্য আরিফ দিব্যকে সংবাদপত্রে কাজ করার সুযোগ দিয়ে সবচেয়ে বড় ‘গুরু দক্ষিণা দিয়েছে’, যা আমি আমৃত্যু শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করব। রাজু আমি আমার পরিবার কোনোদিন তোকে ভুলবে না।
রাজুকে নিয়ে করোনাকালের সেইসব গল্পকথা হারিয়ে যাবে। রাতের পর রাত ওর সাথে কথা বলেছি। করোনা হয়েছিল। সাহস দিয়েছি। জাগিয়ে রেখেছি। ভাপ নিতে বলেনি। চা খেতে বলেছি। লেবু খেতে বলেছি। কত কি। ওর সাহসী অর্ধাঙ্গীনি লোপা পাশে ছিল করোনাকালে। করেনা জয়ী রাজুকে নিয়েও গল্প কম হয়নি। খুব খুব কষ্ট হচ্ছেরে রাজু। তোর দরাজ গলায় রবীন্দ্র সঙ্গীত, আধুনিক গান আর শোনা হবে না।
রাজু আহমেদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন মহল। সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও পরিচিতজনেরা মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন। মৃত্যুকালে রাজু রেখে গেছেন মা, দুই বোন ও স্ত্রীসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী এবং গুণগ্রাহী।
বন্ধু, সহকর্মী ও স্বজনদের কাছে রাজু শুধু একজন সাংবাদিক ছিলেন না; ছিলেন এক প্রাণবন্ত মানুষ, গল্পপ্রিয় বন্ধু, আর অসংখ্য স্মৃতির অংশ।
রাজু, তুমি কি সত্যিই এভাবে চলে গেলে? এত তাড়াতাড়ি? তোমার গান, তোমার লেখা, তোমার হাসি; সবই রয়ে যাবে স্মৃতির ভাঁজে। তুমি নেই, কিন্তু তোমার গল্পগুলো থেকে যাবে দীর্ঘদিন।
