রোজা যেভাবে জীবনের আত্মশুদ্ধি করে

জীবনের ঘুর্ণিঝড়ের কবলে মানুষ এমন ভাবে ফেঁসে যায় সে বাঁচতে চাইলেও বাঁচার কোনো শক্তি, উপায়, বিশ্বাস কিছুই থাকে না। সে যেন কোনো কঠিন এক ভাইরাসে সম্পূর্ণ হ্যাং হয়ে আছে। তখন তার প্রয়োজন হয় নিজেকে আপডেট করা। রোজা মানব জীবনের এমনই একটি রিসেট বাটন যা জীবনের সাথে তাল মেলানোর একটি আপডেট কর্মশালা। আসুন আমরা জেনে নেই এই বিষয়ে কোরআন ও হাদিসের বর্ণনা।
১. রোযা পরহেজগার হবার পথ (সূরা বাকারা- ১৮৩)
জন্মের পর থেকে মানুষের যত দিন যায় ততই মানুষ পাপাচার ও অপরাধের জালে জড়িয়ে পেঁচিয়ে যায়। তখন নিজেকে বাঁচানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় সে যদি রোজা পায় এবং ঠিক মতো তা আদায় করে- তাহলে আল্লাহ তাকে পরিপূর্ণ পাক সাফ জীবন দান করতে পারেন।
২. রোযার প্রতিদান আল্লাহ রাববুল আলামীন নিজেই দিবেন এবং বিনা হিসাবে দিবেন (সহীহ বুখারী- ১৮৯৪)
যখন জীবন এমনই এক নিরাশার অন্ধকারে ঢেকে যায় যে- কোনো যুক্তিতেই মুক্তির আর কোনো পথ অবশিষ্ট থাকে না। এমতাবস্থায় সে যদি রোজা পায় এবং ঠিক মতো তা আদায় করে- তাহলে আল্লাহ তাকে নিজ কুদরতে গায়েবি ভাবে মুক্তির পথ দান করতে পারেন।
৩. রোজা আল্লাহর নিকট কৃতজ্ঞতার প্রকাশ (সুরা বাকারা-১৮৫)
সকল মানুষই জীবনকে উপভোগ করতে পারে না। জীবন নিয়ে মানুষের অনেক অনেক অভিযোগ থাকতে পারে। তবে সেই মানুষগুলো যদি রোজা পায় এবং ঠিক মতো তা আদায় করে- তাহলে তার সমস্ত অভিযোগ আল্লাহ দূর করে দিবেন।
৪. রোযা জাহান্নাম থেকে রক্ষাকারী ঢাল ও দুর্গ (মুসনাদে আহমদ- ১৪৬৬৯)
জীবন কখনো কখনো খুব একাকী হয়ে যায়। চারপাশ শুধু শত্রু ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে সেই মানুষগুলো যদি রোজা পায় এবং ঠিক মতো তা আদায় করে- তাহলে সে এমন এক সঙ্গী পাবে যে তার পক্ষে শক্তি হয়ে দেখা দিবে। যেমন ভাবে পরকালে রোযা মানুষের পক্ষ হয়ে দাঁড়াবে।
৫. রোযাদারের সকল গুনাহ মাফ হয়ে যায় (সহীহ বুখারী- ২০১৪)
নিজের ভুলত্রুটি ও পাপবোধ যখন মানুষ অনুধাবন করতে পারে তখন অনুশোচনা জাগে। কখনো কখনো মানুষ আপনার পাপের জন্য নিজেকে নিজেই ক্ষমা করতে পারে না। তবে সেই মানুষগুলো যদি রোজা পায় এবং ঠিক মতো তা আদায় করে- তাহলে তার সমস্ত অনুশোচনা ধুয়ে মুছে যাবে এবং প্রফুল্ল জীবন লাভ করবে।
৬. রোযা গুনাহের কাফফারা (সহীহ বুখারী- ১৮৬৫)
মানুষের জীবনে কখনো কখনো এমন কোনো গুনাহ হয়ে যেতে পারে, যার আর কোনো ক্ষমা নেই বরং শাস্তিই তার গুনাহের একমাত্র পথ। তবে সেই মানুষ যদি রোজা পায় এবং ঠিক মতো তা আদায় করে- তাহলে রোজা তার ঐ গুনাহের কাফফারা হয়ে যাবে এবং আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিবেন।
৭. রোযাদারের দুআ কবুল হয় (মুসনাদে আহমদ- ৮০৪৩)
একজন মানুষ যখন সবকিছুতেই ব্যর্থ হয়। তার কোনো কিছুই যখন কোনো সার্থকতায় না পৌঁছায়। সেই মানুষ যদি রোজা পায় এবং ঠিক মতো তা আদায় করে- তাহলে তার কাজগুলো পুনরায় সার্থকতা লাভ করবে। সে সফলতার দেখা পাবে।
৮. রোযা হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে দেয় (মুসনাদে বাযযার- ১০৫৭)
পৃথিবী দিন দিন উর্ধ্বমুখী হচ্ছে। এমতাবস্থায় মানুষে মানুষে সৃষ্টি হচ্ছে চরম থেকে চরম বৈষম্য-ভেদাভেদ। আমি কুৎসিত ও সুন্দর, আমি গরীব ও ধনী, আমি মূর্খ ও শিক্ষিত ইত্যাদি ইত্যাদি কষ্ট বুকে বয়ে নিয়ে দিন যাপন করছে অধিকাংশ মানুষ। সেই মানুষ যদি রোজা পায় এবং ঠিক মতো তা আদায় করে- তাহলে আল্লাহ তার অন্তরের সকল ব্যথা দুর করে দিবেন।
৯. আল্লাহর নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম (মুসনাদে আহমদ- ২২১৪০)
পৃথিবী মানুষকে যেভাবে আকর্ষণ করে- মানুষ আল্লাহকেই অস্বীকার করে বসে। পৃথিবীকে তারা বাস্তব আর আল্লাহর অস্তিত্বকে অলীক ভাবতে থাকে। অধিকাংশ মানুষই নাস্তিকতায় ঝুঁকে পড়ছে। আল্লাহ আছে তারা ভাবতে চায় কিন্তু আল্লাহর অস্তিত্বের যৌক্তিকতা তাদের অন্তরে উদয় হয় না। সেই মানুষ যদি রোজা পায় এবং ঠিক মতো তা আদায় করে- তাহলে- তার হৃদয় ও মস্তিষ্ক আল্লাহর সত্যতা উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে।
১০. রোযা মানুষের চিন্তাশক্তির প্রখরতা বৃদ্ধি করে। (সুরা বাকারা-১৮৪)
কিছু কিছু মানুষের জীবনে সবচেয়ে বেশি আফসোস তার জ্ঞান বুদ্ধি কম, সে বারবার ভুল করে আর বারবার ঠকে যায়। তার কোনো পদক্ষেপই সঠিক হয় না। তার জীবনের নাম হয়ে দাঁড়ায় ভুল। সেই মানুষ যদি রোজা পায় এবং ঠিক মতো তা আদায় করে- তাহলে আল্লাহ তাকে গায়েবি ভাবে জ্ঞান দান করেন। তার বুঝ বুদ্ধি খুব প্রখর হয়ে যায়।
আল্লাহ আমাদেরকে সঠিকভাবে রোজা পালন করার তৌফিক দান করুন যাতে আমরা আমাদের জীবনে রোজার পরিপূর্ণ ফজিলত লাভ করতে সক্ষম হই। আমিন।
