চুরির ১৬ বছর পর ফিরেছিল ইভিটার মরদেহ

২৪ ঘণ্টা অনলাইন : আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ফার্স্ট লেডি ইভা পেরন, যিনি ‘ইভিটা’ নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিত, ১৯৫২ সালে মাত্র ৩৩ বছর বয়সে মারা যান। কিন্তু মৃত্যুর পরও তাকে ঘিরে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থামেনি। বরং তার মরদেহ চুরি হয়ে শুরু হয়েছিল ১৬ বছরের এক রহস্যময় যাত্রা।
জরায়ুমুখের ক্যানসারে ইভা পেরনের মৃত্যুর পর স্প্যানিশ অ্যানাটমিস্ট ড. পেদ্রো আরা বিশেষ পদ্ধতিতে তার মরদেহ সংরক্ষণ করেন। শ্রমজীবী মানুষের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় ইভিটার মরদেহ দেখতে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ২০ লাখের বেশি মানুষ তার কফিন দেখেছিলেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
ইভা পেরনের স্বামী ও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুয়ান পেরন ১৯৫৫ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হলে নতুন সরকার পেরনিজমের প্রতীকগুলো মুছে ফেলার উদ্যোগ নেয়। সেই সময় ইভিটার মরদেহও সরিয়ে ফেলা হয়।
এরপর শুরু হয় তার মরদেহ লুকিয়ে রাখার দীর্ঘ অধ্যায়। কখনো সামরিক গোয়েন্দা কেন্দ্র, কখনো শহরের বিভিন্ন গোপন স্থান কিংবা ভ্যানের ভেতরে রাখা হয় মরদেহটি। একপর্যায়ে ১৯৫৭ সালে গোপনে ইতালির মিলানে পাঠিয়ে ‘মারিয়া মাজ্জি দে মাজিসত্রিস’ নামে কবর দেওয়া হয়।
তবে ইভিটাকে তার সমর্থকেরা ভুলে যাননি। বুয়েনস আইরেসের বিভিন্ন দেয়ালে লেখা হতে থাকে—‘ইভা পেরনের মরদেহ কোথায়?’ ধীরে ধীরে তার মরদেহ ফিরিয়ে আনা পেরনপন্থিদের অন্যতম প্রধান দাবিতে পরিণত হয়।
১৯৭১ সালে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর ইভা পেরনের মরদেহ তার স্বামী হুয়ান পেরনের কাছে স্পেনের মাদ্রিদে পাঠানো হয়। নির্বাসনে থাকা পেরন ও তার তৎকালীন স্ত্রী ইসাবেল সেখানে ইভিটার মরদেহ গ্রহণ করেন।
১৯৭৩ সালে হুয়ান পেরন আর্জেন্টিনায় ফিরে ক্ষমতায় এলেও ইভিটার মরদেহ স্পেনেই ছিল। ১৯৭৪ সালে হুয়ান পেরনের মৃত্যুর পর মরদেহটি আবার আর্জেন্টিনায় ফিরিয়ে আনা হয়।
এরপর বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে ইভা পেরনের মরদেহ পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণের কাজ করা হয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর ১৯৭৬ সালের অক্টোবরে তাকে বুয়েনস আইরেসে চূড়ান্তভাবে সমাহিত করা হয়।
নিরাপত্তার জন্য তার মরদেহ রাখা হয় অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি ক্রিপ্টে। মাটির কয়েক মিটার গভীরে নির্মিত সেই সমাধিতে একাধিক গোপন দরজা ও সুরক্ষা ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল, যাতে ভবিষ্যতে কেউ তার মরদেহ সরিয়ে নিতে না পারে।
ইভা পেরনের মৃত্যুর পর তার মরদেহ ঘিরে যে ঘটনাপ্রবাহ তৈরি হয়েছিল, তা শুধু একটি মরদেহের অন্তর্ধানের ইতিহাস নয়; বরং আর্জেন্টিনার রাজনৈতিক বিভাজন, ক্ষমতার লড়াই এবং ইভিটার অসাধারণ জনপ্রিয়তারও এক প্রতীকী অধ্যায়।
