আম রপ্তানিতে সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে বাংলাদেশ

২৪ঘণ্টা অনলাইন : বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আম উৎপাদনকারী দেশ। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সূত্র অনুযায়ী দেশে বছরে প্রায় ২৪ থেকে ২৫ লাখ মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয়। তবে উৎপাদনের তুলনায় রপ্তানির পরিমাণ এখনও অত্যন্ত কম। ২০২৫ মৌসুমে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২,১৯৪ মেট্রিক টন আম রপ্তানি হয়েছে, যা মোট উৎপাদনের মাত্র ০.১ শতাংশেরও কম। এর আগের মৌসুমে (২০২৪-২৫) রপ্তানির পরিমাণ ছিল মাত্র ১,৩২১ মেট্রিক টন।
বর্তমানে বাংলাদেশের আম যুক্তরাজ্য, ইতালি, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, জার্মানি, ফ্রান্স, সুইডেন, সিঙ্গাপুর, কানাডা ও চীনসহ ৩০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এসব দেশের মধ্যে জাপান একটি সম্ভাবনাময় উচ্চমূল্যের বাজার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জাপানের মতো উন্নত বাজারে বাংলাদেশি আমের প্রবেশ দেশের কৃষি অর্থনীতির জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।
তবে এই বাজারে প্রবেশের জন্য উৎপাদন থেকে রপ্তানি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা অপরিহার্য। প্রস্তুতি শুরু করতে হবে বাগান থেকেই। রপ্তানিযোগ্য আমকে অবশ্যই কীটপতঙ্গ, মাটি, আগাছার বীজ এবং অন্যান্য বহিরাগত দূষণমুক্ত হতে হবে। একই সঙ্গে অনুমোদিত বাগান, প্যাকহাউস এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের মাধ্যমে আম সংগ্রহ ও প্রস্তুত করতে হবে।
জাপানের কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থায় ফলের মাছি (ফ্রুট ফ্লাই) অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। এ কারণে রপ্তানির আগে সকল আমকে ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট (VHT) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শোধন করতে হয়। নির্ধারিত তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও সময়কাল বজায় রেখে পরিচালিত এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফলের মাছি এবং অন্যান্য কোয়ারেন্টাইনভুক্ত কীটপতঙ্গ কার্যকরভাবে দমন করা সম্ভব হয়।
তবে সফলভাবে আম রপ্তানি করতে হলে উত্তম কৃষি চর্চা বা গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস (GAP)-এর কোনো বিকল্প নেই। গ্যাপের আওতায় নিরাপদ ও সঠিক মাত্রায় বালাইনাশক ব্যবহার, বাগানের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, সেচ ও সার ব্যবস্থাপনার রেকর্ড সংরক্ষণ, শ্রমিকদের স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা এবং ফল সংগ্রহ ও পরিবহনে স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। এর ফলে উৎপাদিত ফলে ক্ষতিকর রাসায়নিক অবশিষ্টাংশের ঝুঁকি কমে এবং আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তা মান পূরণ করা সহজ হয়।
উত্তম কৃষি চর্চা, নিরাপদ উৎপাদন ব্যবস্থা, ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট, কার্যকর কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রক্রিয়াজাতকরণ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশি আমের জন্য জাপানসহ বিশ্বের অন্যান্য উচ্চমূল্যের বাজারে প্রবেশ ও সম্প্রসারণের পথ আরও সুগম হবে।
তবে রপ্তানি বৃদ্ধির সুফল তখনই অর্থবহ হবে, যখন এর সুবিধা সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছাবে। এজন্য কৃষকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানো এবং কৃষক থেকে রপ্তানিকারকের মধ্যে সরাসরি বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। কৃষক যদি তার উৎপাদিত আমের প্রকৃত মূল্য পান, তবে রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনই নয়, গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন এবং লাখো কৃষকের জীবনমানেরও ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব হবে।
