মুক্তির রজনী শবে বরাত

তানভীরুল আরেফীন : জীবনে চলতে চলতে মানুষ অনেক সময় বিপদ আপদ, পাপবোধ, দুর্ঘটনা, অনুশোচনায় জড়িয়ে পেঁচিয়ে একাকার হয়ে যাচ্ছে। কখনো কখনো দুর্ভোগকে অমাবস্যার রাতের চেয়েও অন্ধকার অনুভব হয়। সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ জানেন যে, মানুষ এমন অন্ধকারে পতিত হতেই পারে। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন– আল্লাহ তোমাদের বোঝা লঘু করতে চান, যেহেতু মানুষ দুর্বলরূপে সৃষ্ট হয়েছে।
(সুরা নিসা, আয়াত ২৮)
এ বিষয়ে রাসূল সা. বলেন– প্রত্যেক আদম সন্তানই পাপী আর পাপীদের মধ্যে তারাই উত্তম যারা তওবা করে। (তিরমিজী, হাদীস-২৪৯৯) । আসছে মুসলমানদের কাঙ্ক্ষিত রজনী শবে বরাত বা মুক্তির রজনী। হিজরী মাস অনুযায়ী শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রজনীই শবে বরাত। ইংরেজি বর্ষ অনুযায়ী এ বছর ৪ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে শবে বরাত হবার কথা।তবে কিছু কিছু আকিদার লোকদের কাছে এই রাতের কোন গুরুত্ব না থাকলেও মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি বিশেষ অংশের কাছে এই রাত মুক্তির রজনী।
কেন শবে বরাত আমাদের জন্য মুক্তির রজনী?
হযরত আয়িশা রা. বলেন– রাসূল সা. জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি জান এটা কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভাল জানেন। রাসূল বললেন– এটা হল অর্ধ শাবানের রাত। আল্লাহ তাআলা অর্ধ শাবানে তাঁর বান্দাদের প্রতি নজর দেন এবং ক্ষমাপ্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করেন, অনুগ্রহপ্রার্থীদের প্রতি অনুগ্রহ করেন। আর বিদ্বেষ পোষণকারীদেরকে ছেড়ে দেন তাদের অবস্থাতেই। (বায়হাকী, ৩য় খন্ড-৩৮২পৃ )
এই হাদীস দ্বারা আমাদের নিকট প্রমাণিত হয় যে– এটি একটি মুক্তির রাত, তাই এই রাতকে শবে বরাত বলা হয়। শব অর্থ রাত আর বরাত অর্থ মুক্তি।
অপর এক বর্ণনায় আয়েশা রা. বলেন, আমি এক রাতে মহানবীকে বিছানায় পেলাম না। তাই আমি অত্যন্ত পেরেশান হয়ে খোঁজাখুঁজি আরম্ভ করলাম। খুঁজতে খুঁজতে দেখি, তিনি জান্নাতুল বাকীর মধ্যে (জান্নাতুল বাকী একটি কবরস্থানের নাম) মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনায় মগ্ন। তখন তিনি আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে আয়েশা! আমার নিকট হযরত জিবরাঈল আ. উপস্থিত হয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, আজ রাত হল অর্ধ শাবানের রাত (অর্থাৎ- শবে বারাআত)। এ রাতে আল্লাহ তাআলা অধিক পরিমাণে জাহান্নামবাসী লোকদেরকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন।(মিশকাত শরীফ-১১৫ পৃ )
এই হাদীস দ্বারা আমাদের নিকট প্রমাণিত হয় যে, এই রাতে কবর জিয়ারত করাও অত্যন্ত ছওয়াবের।অপর এক বর্ণনায়- রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন– পনেরো শাবান যখন আসে, তখন তোমরা রাতটি ইবাদত বন্দেগীতে কাটাও এবং দিনে রোযা রাখ। কেননা এ রাতে সূর্যাস্তের পর আল্লাহ তাআলা প্রথম আসমানে আসেন এবং বলেন, কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করবো। আছে কি কোন রিযিকপ্রার্থী? আমি তাকে রিযিক দিব। এভাবে সুবহে সাদিক পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা মানুষের প্রয়োজনের কথা বলে তাদেরকে ডাকতে থাকেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস-১৩৮৪, বাইহাকী-শুআবুল ঈমান, হাদীস-৩৮২৩ )
শাবান মাসে বেশী বেশী নফল রোযা রাখার কথা বহু হাদীসে এসেছে এবং আইয়ামে বীজ অর্থাৎ প্রতি চন্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোযা রাখার বিষয়টি দলমত নির্বিশেষে গ্রহণযোগ্য। এ বিষয়ে হযরত আশরাফ আলী থানভী র. বলেন– হাদীসে শবে বরাতের তিনটি কাজ করাকে সওয়াব ও বরকত লাভের উপায় বলা হয়েছে। প্রথমতঃ শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে কবরস্থানে গিয়ে মৃতদের জন্য দোয়া ও ইস্তেগফার করা। সাথে সাথে গরীব মিসকীনদের কিছু দান করে সে দানের সওয়াবটুকু ঐ মৃতদের নামে বখশে দেয়া। দ্বিতীয়তঃ রাত জেগে একা একা বা কয়েক জন জড়ো হয়ে এক সাথে ইবাদতে মশগুল থাকা। তৃতীয়তঃ শাবানের পনেরো তারিখ নফল রোযা রাখা। তবে এ রাতে খিচুড়ি বন্টন, হালুয়া রুটি খাওয়া, ঘরদোর পরিপাটি, আলোকসজ্জা ইত্যাদি করা কিছু কিছু লোকদের কাছে- 'না জায়িয' এবং তাদের কাছেই 'না জায়িয' যাদের কাছে এ রাতের কোন গুরুত্ব নেই। তারা উপরোক্ত হাদীসগুলোও দূর্বল বলে গণ্য করে।
মূলত এগুলো যদি ইবাদত, রাত্রিজাগরণ ও দান সদকায় উৎসাহ যোগায়- তাহলে এগুলো কোন মতেই 'না জায়িয' নয়। কেননা আল্লাহ বলেন– পূণ্যবানরা আল্লাহর প্রতি তাদের ভালবাসার কারণে মিসকীন, ইয়াতীম ও অসহায়কে খাবার খাওয়ায়। (সুরা ইনসান, আয়াত-৮)
এই আয়াত দ্বারা আমাদের নিকট প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর ওয়াস্তে খাবার খাওয়ানো পূণ্যের কাজ ও আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ।তবে খেয়াল রাখতে হবে, এ রাতে জাগ্রত থাকতে গিয়ে ফজরের নামাজ ছুটে না যায় এবং কোন হারাম কাজ না হয়, বরং সারা জীবনের গুনাহ থেকে তওবা করে এ রাতে পবিত্র জীবন যাপনের সংকল্প নেয়াই এ রাতের মাহাত্ম্য। আল্লাহ আমাদের সকলকে এ রাতের সুন্দর জীবন গঠনের সুযোগকে পরিপূর্ণ কাজে লাগানোর তৌফিক দান করুন। আমিন।
