মেধাবী রূপকথার গল্পের উপখ্যান

রাজপুত সাইয়ান ইমরুল
প্রায় ৩ ঘণ্টার বর্ণিল অনুষ্ঠান। ব্রিটিশ কাউন্সিলের অধি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মেধাবী বরণানুষ্ঠান। ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর। সন্ধ্যা ৭টা। আলো ঝলমল রেডিসন ব্লু হোটেল। আয়োজন ব্রিটিশ কাউন্সিলের স্কলারস অ্যাওয়ার্ড ২০২৫-এর। যারা সেরা তাদের জন্য আয়োজন। তাদেরই একজন সানিডেল স্কুলের ও-লেভেল পরীক্ষায় বিরল সাফল্যের অংশীজন রূপকথা। মাইক্রোফোনে নাম ঘোষণার পর রূপকথার হাতে তুলে দেওয়া হলো সানিডেলের সেরা হিসাবে ব্রিটিশ কাউন্সিলের স্কলারস অ্যাওয়ার্ড ২০২৫ পুরস্কার। এ যেনো উৎসব রঙিন একদিন রূপকথার পরিবারের জন্য। যেখানে কাছে থেকে মেধাবী মেয়ের আনন্দযজ্ঞের আস্বাদ গ্রহণ করেছেন বাবা-মা। এমন ঘটা আয়োজন েচলেছে রাত ১০ অবদি।

রূপকথা, শুধু একটি নাম নয়। ভিন্ন এক গল্পের নাম। রূপকথা; গল্পের রাজকন্যা না হয়েও এক গল্পময় মেধাবী মুখ। বলছি সেই রূপকথার গল্প। যার পুরো নাম সাইসী রূপকথা ইমরুল। স্বপ্নময়তা যাকে ছুঁয়ে আছে। যে নিজের প্রচেষ্টায় লিখেছেন এক গল্পময় অধ্যায়।
রূপকথা বাবা ইমরুল আর মা মনামী কোলজুড়ে এসেছেন ২০০৮ সালে। পড়াশুনার হাতেখড়ি সানিডেল স্কুলের করিডোরে, সেই ৩ বছর বয়স থেকেই। পড়াশুনার শুরুটা ছিল গড়পড়তা।। ফাইনালে পাস করাটাই ছিল টার্গেট। পড়ায় মন-ধ্যান না থাকলেও চোখে ছিল স্বপ্নময় বিশালতার। হৃদমাঝারে এক অদম্য জেদ কাজ করত- ‘একদিন এগিয়ে যাবোই।’ যা তাকে স্বপ্ন-সাহস জুগিয়েছে।
কিন্তু রূপকথা রূপকথা হয়ে ওঠেন ৭ম শ্রেণীতে পড়ার সময়। তার ভাই রাজপুত একই স্কুলে এক বছরের সিনিয়র। মেধাবী ছাত্র হিসেবে বিস্তর তার সুখ্যাতি। ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ফাইনাল পরীক্ষার রূপকথার রেজাল্ট কার্ড দেখে তার বাবা হতাশ কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘মা গো, তোর রেজাল্ট আনতে আমার খুব লজ্জা লাগে। তোর ভাইয়ের পাশে তোর রেজাল্ট আমাকে বেশ বিব্রত করে।’ ওই বাক্যগুলোই জাদুর কাঠির মতো কাজ করেছিল। রূপকথার আত্ম অহমে আঘাত করেছিল দারুণভাবে। পাল্টে যায় রূপকথা জীবন অধ্যায়। টার্গেট নিয়ে পড়াশোনায় মগ্ন হয়ে পড়েন। ঘটনার সেই দিনক্ষণ ২০২২ সালের ৬ মে। বাবার এক মোটিভেশন রূপকথার জীবনকে বদলে দিয়েছিল। তবে ছোট্টবেলা থেকে পড়ার গল্পে উথাল-পাথাল থাকলেও রূপী নাচ, খেলাধুলা ও স্কাউটিংয়ে জুড়িহীন। স্কাউটস কাপ্টেন। তার নেতৃত্বগুণ সকলের নজর কেড়েছে। কাড়ছে এখনো। সাথে যোগ হয়েছে ইভেন্টকে সেই রূপকথার মতোই সাজানো। স্কুলের ইভেন্ট মানেই রূপকথার রাজ্যের আঙিনা।
রূপকথার পিতা মো. ইমরুল আলম অবসরপ্রাপ্ত মেজর। ক্যাপ্টেন থাকাকালীন এমবিএ ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে ফাইন্যান্স ফর নন-ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট (এফএনএম) ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। স্কুল-কলেজ জীবন কেটেছে ক্যাডেট কলেজে। খেলাধুলা বিরল পারদর্শী ইমরুল ‘কলেজ ব্লু’ খেতাব পান শ্রেষ্ঠ ক্যাডেট হিসেবে। সেনাবাহিনী কালচারাল নাইটে হয়েছেন ‘মোষ্ট হ্যান্ডসাম অফিসার’। কারাতে প্রতিযোগিতায় জাতীয় প্রতিযোগিতায় তার দল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুবাদে পেয়েছেন ‘আর্মি কালার’ । ৩০ বছর বয়সে জুডো ফেডারেশনের সর্বকনিষ্ঠ সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তাক লাগিয়েছেন। সেনাপর্ব শেষে চাকরি-বাকরিও কম করেন নি। এখন নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এক্সক্লুসিভ গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সিইও। ২০১৭ সালে কানাডায় স্থায়ী বসবাসের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক হিসেবে দেশে ফিরে আসেন।

রূপকথার মা ডা. কানিজ ফাতেমা মনামী একজন খ্যাতনামা চিকিৎসক। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে ২৪তম বিসিএসে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। পরে শিশু ও শিশু-নিউরোলজিতে এফসিপিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে (সাবেক পিজি) যোগ দেন এবং বর্তমানে শিশু নিউরো ও ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
মেধাবী বাবা-মায়ের আদুরে কন্যা একদিন সেই পথেই হাঁটবেন এটাই সত্য। হয়েছেও তাই। রূপকথায় উজ্জ্বল ভবিষ্যতের বাংলাদেশ খুঁজে বেড়ান মা-বাবা। মেয়ের সাফল্যে আপ্লুত বাবা মো. ইমরুল আলম বলেছেন, আমি চাই আমাদের মেয়ে শুধু কৃতি শিক্ষার্থী হয়েই বেড়ে ওঠুক তা নয়; সবার ওপর সে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে সমাজে নিজকে প্রতিষ্ঠা করুক। ‘ রূপকথার মা ডা. কানিজ ফাতেমা মনামী বেলেছেন, ‘আমি মেয়েকে ঘিরে স্বপ্ন দেখি আদর্শ স্কুল প্রতিষ্ঠার। যে স্কুলে শিক্ষার্থীদের শেখানো হবে সত্য কথা বলা, সৎ পথে চলা ও মানুষকে মানুষ বিবেচনা করা।’ রূপকথা; দেশের জন্য রূপকথা হয়ে ওঠুক এই ভাবনা আপনি-আমি সবাই-ই ভাবতে পারি।
