পূজাসামগ্রীর দাম বাড়ায় পুরান ঢাকায় কমেছে বেচাকেনা

২৪ঘণ্টা অনলাইন: শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে রাজধানীর পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার, তাঁতিবাজার ও লক্ষ্মীবাজারে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমা তৈরি, রং করা ও সাজসজ্জার কাজে ব্যস্ত কারিগররা। তবে উৎসবের আমেজের মধ্যেও পূজাসামগ্রীর বাজারে দেখা দিয়েছে মন্দা। জ্বালানি, পরিবহন ও আমদানি খরচ বাড়ায় গত বছরের তুলনায় বেড়েছে প্রতিমার সাজসজ্জা ও পূজার বিভিন্ন উপকরণের দাম। ফলে বিক্রি কমেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
১০ অক্টোবর মহালয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসব ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। উৎসব সামনে রেখে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী এলাকাগুলোতে চলছে প্রতিমা ও মণ্ডপ সাজানোর কাজ। প্রতিমাশিল্পী ও দোকানিদের ব্যস্ততা থাকলেও বাজারে ক্রেতাদের উপস্থিতি প্রত্যাশার তুলনায় কম।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন শিল্পী বিপ্লব দাস। এবার শাঁখারীবাজারের শ্রীশ্রী রাধা মাধব জিউদেব বিগ্রহ মন্দিরসহ তিনটি মণ্ডপের প্রতিমা তৈরির দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। বর্তমানে প্রতিমায় মাটির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এরপর শুরু হবে রং করা এবং শাড়ি, পরচুলা ও অলংকার দিয়ে সাজানোর কাজ। সব মিলিয়ে চার-পাঁচ দিনের মধ্যে কাজ শেষ হবে বলে জানান তিনি।
বিপ্লব দাস বলেন, দুর্গাপূজার প্রতিমা তৈরিতে বিশেষ যত্ন নিতে হয়। দেবী দুর্গার পাশাপাশি সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ ও অসুরের প্রতিমা তৈরি করতে হয়। সঙ্গে থাকে ময়ূর, হাঁস, পেঁচা, ইঁদুর ও সিংহের মতো বাহন। সবকিছু মিলিয়ে প্রতিমার পূর্ণাঙ্গ সেট তৈরি করতে হয়।
প্রতিমার নকশায়ও এসেছে পরিবর্তন। শিল্পীদের ভাষ্য, ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক ঢাকেশ্বরী মডেলের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের পছন্দের আধুনিক অ্যাকশন মডেলের প্রতিও আগ্রহ বাড়ছে।
তাঁতীবাজার পূজা কমিটির সভাপতি চন্দন দে জানান, এ বছর শাঁখারীবাজার ও তাঁতীবাজারে ২২টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা উদযাপিত হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সুন্দরভাবে আয়োজন সম্পন্ন করতে কাজ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাড়তি দামে চাপে ব্যবসায়ীরা: পূজার সাজসজ্জার দোকানগুলোতে এবার বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় এবং আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের দাম বাড়াতে হয়েছে।
শাঁখারীবাজারের সাজঘর দোকানে প্রতিমার মুকুটের সেট বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৭ হাজার টাকায়। গত বছর এর দাম ছিল ২০০ থেকে ৬ হাজার টাকা। আগে ১৯০ টাকার চুলের ক্লিপ এখন বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ২৬০ টাকায়। শাড়ির কাপড়ের দাম প্রতি গজে ৫০ থেকে ৬০ টাকা বেড়েছে। ভালো মানের কাপড়ের দাম প্রতি গজ ৮০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১০০ টাকা।
পুঁতির মালার দামও বেড়েছে। গত বছর ২০ টাকার মালা এখন বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকায়। ভালো মানের একটি সম্পূর্ণ মালার দাম ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা হয়েছে। কেজিপ্রতি পুঁতির মালার দাম ৪০০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০০ টাকায়।
এ ছাড়া প্রতিমার অস্ত্রের দামও বেড়েছে। আগে এসব পণ্য ৮০ থেকে ৭৫০ টাকায় পাওয়া গেলেও এখন দাম ১৩০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত।
সাজঘর দোকানের মালিক দীপক ধর বলেন, বিক্রি হচ্ছে, তবে আগের মতো নয়। অধিকাংশ পণ্য ভারত থেকে আমদানি করতে হয়। সেখানে দাম বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় ও করের প্রভাব পড়ছে বাজারে। পাশাপাশি পরিবহন খরচও বেড়েছে।
তিনি জানান, আগে পণ্য পরিবহনে যেখানে প্রায় ১৫০ টাকা খরচ হতো, এখন সেখানে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। বাড়তি দামের কারণে ক্রেতারাও এখন দামি পণ্যের পরিবর্তে কম দামের সামগ্রী কিনছেন। পণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে, মানুষের আয় সেভাবে বাড়েনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বেড়েছে প্রতিমা তৈরির খরচ, কমেছে ঢাকের দাম: পূজাসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে প্রতিমা তৈরির খরচেও। আকার ও উচ্চতাভেদে গত বছর যে প্রতিমার সেট তৈরিতে ৮০ থেকে ৮৫ হাজার টাকা ব্যয় হতো, এবার তা বেড়ে প্রায় ৯০ হাজার টাকা হয়েছে।
তবে ঢাকের বাজারে কিছুটা স্বস্তি রয়েছে। কারিগর সুবল মনিদাশ জানান, গত বছর ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হওয়া ঢাক এবার ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে পুরান ঢাকায় দুর্গাপূজার প্রস্তুতি এগিয়ে চললেও পূজাসামগ্রীর বাড়তি দাম ও কম বিক্রি নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন ব্যবসায়ীরা। শেষ মুহূর্তে ক্রেতা বাড়বে এবং বাজারে বেচাকেনা স্বাভাবিক হবে—এমন প্রত্যাশা তাঁদের।
