বিয়ের বয়স কমানোর প্রতিবাদে রুখে দাঁড়িয়েছে গার্লস নট ব্রাইডস

২৪ঘণ্টা অনলাইন : মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৬ ও ছেলেদের ১৮ বছর নির্ধারণের দাবি তুলেছেন পঞ্চগড় জেলা মুসলিম নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার সমিতির সদস্যরা। এ দাবিকে বাল্যবিবাহ উৎসাহিত করার কৌশল আখ্যা দিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে গঠিত প্ল্যাটফর্ম গার্লস নট ব্রাইডস বাংলাদেশ।
২৯ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার দুপুরে পঞ্চগড় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে কর্মসূচি পালন করেন রেজিস্ট্রাররা। পরে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর আট দফা দাবিতে স্মারকলিপি দেন তাঁরা। বিয়ের বয়স কমানো ছিল এর অন্যতম দাবি।
সমিতির সভাপতি এ আর এম শহীদুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের আবহাওয়া এবং মোবাইল-ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ায় ছেলেমেয়েরা ১২ বছরের মধ্যেই শারীরিক পরিপূর্ণতা পাচ্ছে। তাঁর দাবি, এতে অনেকে অনৈতিক কাজে জড়াচ্ছে। তিনি আরও বলেন, নির্ধারিত বয়সের আগেই স্থানীয়ভাবে হলফনামার মাধ্যমে বিয়ে হচ্ছে, কিন্তু তা নিকাহ নিবন্ধনে আসছে না। ফলে পারিবারিক কলহ বা নির্যাতনের শিকার হলে ভুক্তভোগীরা যথাযথ আইনি সহায়তা পান না। তাঁর ভাষ্য, এসব বিবেচনায় বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ ও বিধিমালা, ২০১৮ সংশোধন করে ছেলেদের ১৮ ও মেয়েদের ১৬ বছর নির্ধারণ করা উচিত।
সমিতির সদর উপজেলা কমিটির সভাপতি আরাফাত ইদ্রিস সাংবাদিকদের বলেন, বিয়ের বয়স ১৬ ও ১৮ হলে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ হবে এবং সমাজে অনৈতিক কাজ ও বিশৃঙ্খলা কমবে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বক্তারা দাবি করেছেন, বিশ্বের কিছু দেশে ছেলেদের ১৮ ও মেয়েদের ১৬ বছরে বিয়ের সুযোগ রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কোনো দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি।
বিয়ের বয়স ছাড়া স্মারকলিপিতে আরও যেসব দাবি রয়েছে—
- ২০০৯ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালার ১৩ ধারা অনুযায়ী বর্তমানে কর্মরত নিকাহ রেজিস্ট্রারদের বহাল রাখা
- অবসরভাতা না থাকায় অবসরের বয়স ৬৭ থেকে ৭৫ বছর করা
- বাবার অবসরের পর যোগ্যতার ভিত্তিতে পুত্রকে সরাসরি রেজিস্ট্রার নিয়োগ
- রেজিস্ট্রার নিয়োগে স্থানীয় সংসদ সদস্যের ডিও লেটার প্রথা বন্ধ
- ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অহেতুক হয়রানি বন্ধ
- বিয়ের নিবন্ধন ফি বৃদ্ধি
- বিয়ে ও তালাকের ক্ষেত্রে নোটারি পাবলিকের হলফনামা বন্ধ
কর্মসূচিতে সমিতির সাধারণ সম্পাদক শেখ মো. হাবিবুর রহমানসহ সদর, বোদা, আটোয়ারী, দেবীগঞ্জ ও তেঁতুলিয়া উপজেলার নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক শুকরিয়া পারভীন জানান, স্মারকলিপি গ্রহণ করা হয়েছে। এটি পড়ার পর যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। তিনি বলেন, স্মারকলিপি দেওয়া বা নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনের নিজস্ব মতামত থাকে না।
এ দাবির প্রতিবাদে ১ অক্টোবর বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়েছে গার্লস নট ব্রাইডস বাংলাদেশ। বিবৃতিতে বলা হয়, দেশে যখন বাল্যবিবাহের প্রবণতা ঊর্ধ্বমুখী এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ, তখন এ ধরনের দাবি বাল্যবিবাহকে উৎসাহিত করার অপকৌশল। জোটের মতে, এটি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার এবং শিশু অধিকারের পরিপন্থী।
বিবৃতিতে বলা হয়, সরকারি নিবন্ধনপ্রাপ্ত নিকাহ রেজিস্ট্রাররা আইন অনুযায়ী বিয়ে নিবন্ধনের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের কাছে প্রত্যাশা, তাঁরা প্রচলিত আইন মানবেন এবং তা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবেন। বিয়ের বয়স কমানোর দাবি সেই দায়িত্বশীল ভূমিকার পরিপন্থী। জোটটি রেজিস্ট্রারদের জনস্বার্থ, প্রচলিত আইন ও মানবাধিকারের প্রতি বিশেষ দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এবং এ ধরনের তৎপরতা প্রতিরোধে সরকারের বলিষ্ঠ অবস্থান ও কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেছে।
বিবৃতিতে স্বাক্ষর করা ৩১টি সংগঠনের মধ্যে রয়েছে— প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, সেভ দ্য চিলড্রেন, দলিত, আইসিডিডিআ’বি, বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতি, কথোওয়াইন (ভালনারেবল পিপলস ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন), কেয়ার বাংলাদেশ, পিএসটিসি, ব্র্যাক, জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম, এমজেএফ, আভাস, একশনএইড বাংলাদেশ, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), এসডিএস (শরীয়তপুর ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, বিএনডব্লিউএলএ (BNWLA) বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি, বাংলাদেশ মডেল ইয়ুথ পার্লামেন্ট, এডুকো বাংলাদেশ, হোয়াইট রিবন অ্যালায়েন্স, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ, ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি বাংলাদেশ, কমপ্যাশন ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, ভিএসও বাংলাদেশ, ব্র্যাক জেমস পি গ্র্যান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, টেরে দেজ হোমস, নেদারল্যান্ডস, মেরি স্টোপস বাংলাদেশ, পপুলেশন কাউন্সিল, মিশন সেভ বাংলাদেশ, একল্যাব এবং উদ্দীপন।
বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ ও ছেলেদের ২১ বছর। আইনে বাল্যবিবাহের আয়োজন, সম্পাদন, সহায়তা ও নিবন্ধনের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির বিধান আছে। তবে আইনের ১৯ ধারায় একটি ব্যতিক্রম রয়েছে। নির্ধারিত বিশেষ প্রেক্ষাপটে অপ্রাপ্তবয়স্কের সর্বোত্তম স্বার্থে আদালতের নির্দেশ এবং বাবা-মা বা অভিভাবকের সম্মতিতে বিয়ে হলে তা অপরাধ বলে গণ্য হয় না।
গার্লস নট ব্রাইডস বাংলাদেশ কোয়ালিশন সরকারী নিবন্ধনপ্রাপ্ত নিকাহ রেজিস্ট্রারদের জনস্বার্থ, দেশের প্রচলিত আইন ও মানবাধিকারের প্রতি বিশেষ দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। একইসঙ্গে নেটওয়ার্কটি এই ধরনের অপতৎপরতা প্রতিরোধে সরকারের বলিষ্ঠ অবস্থান ও কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করছে।
