জ্বালানি সংকটে উৎপাদন-রপ্তানি হুমকিতে

২৪ ঘণ্টা অনলাইন : গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে দেশের শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বড় শিল্পগোষ্ঠী থেকে শুরু করে টেক্সটাইল, ডাইং, পোশাক, ইস্পাত ও নিত্যপণ্য উৎপাদনকারী বিভিন্ন কারখানায় কমেছে উৎপাদন। কোথাও কারখানা বন্ধ, আবার কোথাও সক্ষমতার অর্ধেকেরও নিচে উৎপাদন চলছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও বাজারে পণ্যের সরবরাহ নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ একপর্যায়ে প্রায় ১৯৩ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে। বিপরীতে দৈনিক চাহিদা ছিল প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ছিল প্রায় অর্ধেক। পরে এলএনজি সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও ঘাটতি পুরোপুরি কাটেনি।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, মেঘনা গ্রুপের ৫৭টি কারখানা ১০ আগস্ট রাত থেকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে বন্ধ রয়েছে। টি কে গ্রুপের প্রায় ২০টি কারখানাও বন্ধ থাকার কথা জানা গেছে। নাবিল গ্রুপের বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন সক্ষমতা ৪০ থেকে ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। বিএসআরএমেরও ১০টি প্রধান কারখানা বন্ধ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
হবিগঞ্জে ১৭১টি কারখানা কয়েক দিন পুরোপুরি বন্ধ থাকার তথ্য এসেছে। নরসিংদী-মাধবদী, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলেও গ্যাসের কম চাপের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে টেক্সটাইল খাতে প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপ না থাকায় উৎপাদন সক্ষমতা কমে গেছে।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। জুলাইয়ের শেষ দিকে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন একপর্যায়ে ৪ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে যায়। পরে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়লে উৎপাদন প্রায় ৫ হাজার ৩০০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়। ফলে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি একই সঙ্গে শিল্পকারখানার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
সংকটের পেছনে এলএনজি সরবরাহ বিঘ্ন : বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে সরবরাহ-বিঘ্ন। ২১ জুলাই আগুনে টার্মিনালের বৈদ্যুতিক কেবল ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটি দুই সপ্তাহের বেশি সময় বন্ধ ছিল। এতে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। পরে একটি রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট আংশিক চালু হলে প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়।
এ ছাড়া বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজি কার্গো সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংকটের পেছনে দীর্ঘমেয়াদি কারণও রয়েছে। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ার বিপরীতে চাহিদা বাড়ছে। ফলে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে।
বাড়ছে উৎপাদন ব্যয় : গ্যাসের ঘাটতির কারণে অনেক শিল্পকারখানায় বয়লার, চুল্লি ও উৎপাদনযন্ত্র স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ না থাকলেও বন্ধ রাখতে হচ্ছে উৎপাদন লাইন। পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছু প্রতিষ্ঠান বিকল্প হিসেবে ডিজেলসহ ব্যয়বহুল জ্বালানি ব্যবহার করছে। এতে উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে।
টেক্সটাইল খাতেও সংকটের প্রভাব স্পষ্ট। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রয়োজনীয় ৮ পিএসআই গ্যাসচাপের বিপরীতে কোনো কোনো কারখানায় ২ থেকে ৩ পিএসআই চাপ পাওয়া যাচ্ছে। এতে সুতা উৎপাদন, ডাইং ও ফিনিশিংসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
রপ্তানি ও কর্মসংস্থানে শঙ্কা : গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের সরবরাহ ব্যবস্থা। উৎপাদনের একটি ধাপ ব্যাহত হলে পরবর্তী ধাপেও এর প্রভাব পড়ে। ফলে নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি আদেশ পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিদেশি ক্রেতারাও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে খোঁজ রাখছেন। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হবে কি না—এ বিষয়টি অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রেও বিবেচনা করছেন তারা।
শুধু রপ্তানিমুখী শিল্প নয়, চিনি, ভোজ্যতেল, আটা, ময়দা, সুজি ও ফিডের মতো নিত্যপণ্য উৎপাদনেও গ্যাস ও বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। দীর্ঘদিন উৎপাদন কম থাকলে বাজারে পণ্যের সরবরাহেও চাপ তৈরি হতে পারে।
প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ: শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, সংকটের সময়ে গ্যাস রেশনিং করতে হলে তা পরিকল্পিতভাবে করা প্রয়োজন। কোন এলাকায় কখন গ্যাসের চাপ কমবে, সে বিষয়ে আগাম তথ্য দেওয়া হলে উৎপাদন, শ্রমিকের কর্মঘণ্টা ও রপ্তানি চালানের পরিকল্পনা করা সহজ হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাৎক্ষণিকভাবে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধি, এলএনজি আমদানি ও টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ানো এবং জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ জরুরি।
বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে, একটি এলএনজি টার্মিনালে বড় ধরনের সরবরাহ-বিঘ্নের প্রভাব শুধু গ্যাস খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প, রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও বাজার সরবরাহে। তাই তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
