ক্যারিয়ারের শেষ বাঁশি বাজাতে প্রস্তুত মেসি

অনিন্দ্য আরিফ দিব্য
বিশ্বকাপের ট্রফিটি এবার আর ছুঁয়ে দেখা হয়নি। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হারার পর লিওনেল মেসির চোখে ছিল হতাশার ছায়া, আর কোটি ভক্তের মনে একটাই প্রশ্ন— এবার কি তবে শেষ? সেই প্রশ্নের উত্তর ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। আর্জেন্টিনার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য বলছে, জাতীয় দলের জার্সিতে লিওনেল মেসির মহাকাব্যিক যাত্রা শেষ অধ্যায়ে পৌঁছে গেছে। তবে বিদায়টা হবে না তড়িঘড়ি করে, হবে না কোনো আকস্মিক ঘোষণায়। বরং নিজের মতো করেই, ধীর-স্থির পদক্ষেপে, নতুন প্রজন্মের হাতে দায়িত্ব তুলে দিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানাবেন সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার।
২০২৬ বিশ্বকাপই ছিল মেসির শেষ বিশ্বমঞ্চ। আর কোনো বিশ্বকাপে আকাশি-সাদা জার্সিতে তাকে দেখা যাবে না। তবে এখনই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন না তিনি। আর্জেন্টিনা দলে চলমান প্রজন্ম পরিবর্তনের সময়টুকুতে পাশে থাকতে চান। নতুনদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে, তাদের পথচলার সঙ্গী হতে আরও কয়েক মাস মাঠে থাকবেন। এরপরই নামবে পর্দা— এক অনন্য, গৌরবময় এবং ইতিহাসে অমর হয়ে থাকা আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের।
এদিকে বিদায়কে স্মরণীয় করে রাখতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ)। বিশ্বের কোটি কোটি ভক্তের ভালোবাসার এই মহাতারকার জন্য আয়োজন করা হবে একটি বিশেষ বিদায়ী ম্যাচ। সেটি হবে শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়; হবে এক যুগের প্রতি শ্রদ্ধা, এক কিংবদন্তিকে সম্মান জানানোর মহোৎসব। যে ফুটবলার দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনার স্বপ্ন, আবেগ আর গৌরবের প্রতীক হয়ে ছিলেন, তাকে বিদায় জানানোও হবে রাজকীয় আয়োজনে। আজকের ফুটবলে অনেক কিংবদন্তিই নীরবে বিদায় নেন— একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট কিংবা ছোট্ট সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে। কিন্তু লিওনেল মেসি কেবল একজন ফুটবলার নন; তিনি একটি প্রজন্মের অনুভূতি, কোটি মানুষের শৈশব, অসংখ্য অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলা এক জাদুকরের নাম। তাই তার বিদায়ও হবে অন্য সবার চেয়ে আলাদা, স্মৃতির অ্যালবামে চিরস্থায়ী হয়ে থাকার মতো।
বয়স তখন ৩৯। তবুও সময় যেন মেসির পায়ের জাদু কেড়ে নিতে পারেনি। ২০২৬ বিশ্বকাপে ৮টি গোল ও ৪টি অ্যাসিস্ট করে তিনি ছিলেন টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা। মাঠে প্রতিটি স্পর্শ, প্রতিটি পাস, প্রতিটি ড্রিবল যেন মনে করিয়ে দিচ্ছিল—প্রতিভার কোনো বয়স হয় না। তবুও ফুটবলের নির্মম বাস্তবতা হলো, একসময় সেরাদেরও থামতে হয়। স্পেনের বিপক্ষে ফাইনাল হারের পর ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি তিনি। শুধু নীরব ছিলেন। আর সেই নীরবতার মধ্যেই যেন লুকিয়ে ছিল হাজারো অপ্রকাশিত অনুভূতি।
কোচ লিওনেল স্কালোনি অবশ্য জানিয়েছিলেন, জাতীয় দলের দরজা মেসির জন্য সব সময় খোলা থাকবে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির পথচলা ছিল সংগ্রাম, সমালোচনা, ব্যর্থতা এবং অবশেষে মহিমায় উজ্জ্বল এক বিজয়গাথা। ক্যারিয়ারের মাঝপথে টানা কয়েকটি বড় ফাইনাল হার তাকে কঠিন সমালোচনার মুখে ফেলেছিল। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন— মেসি কি আদৌ আর্জেন্টিনাকে বড় কোনো শিরোপা এনে দিতে পারবেন? মেসি উত্তর দিয়েছিলেন মাঠে। তার নেতৃত্বেই আর্জেন্টিনা জিতেছে ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালের ফিনালিসিমা, ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা। দীর্ঘ প্রায় ৪ দশকের বিশ্বকাপ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে তিনি নিজেকে শুধু আর্জেন্টিনার নয়, ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অধিনায়ক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ বিশ্বকাপেও দলকে তুলেছিলেন ফাইনালে, যদিও শেষ হাসিটা হাসতে পারেননি। তবে ফুটবলের ইতিহাস কখনো শুধু একটি ম্যাচ দিয়ে লেখা হয় না।
একটি ফাইনালের হার মেসির দুই দশকের সৃষ্ট মহাকাব্যকে ম্লান করতে পারে না। কারণ তিনি কেবল গোল করেছেন, ট্রফি জিতেছেন—এমন নয়; তিনি ফুটবলকে সৌন্দর্যের নতুন ভাষা শিখিয়েছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, প্রতিভা যখন পরিশ্রমের সঙ্গে মিশে যায়, তখন অসম্ভবও বাস্তবে রূপ নেয়। যেদিন লিওনেল মেসি শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে মাঠ ছাড়বেন, সেদিন শুধু একজন ফুটবলারের বিদায় হবে না। শেষ হবে একটি যুগের, একটি প্রজন্মের, কোটি মানুষের আবেগের দীর্ঘতম অধ্যায়। স্টেডিয়ামের আলো হয়তো নিভে যাবে, বাঁশিও বাজবে শেষবারের মতো; কিন্তু ফুটবল নামের অনন্ত কাব্যে লিওনেল মেসি চিরকাল উজ্জ্বল এক নক্ষত্র হয়েই জ্বলবেন।
