হামে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর বহুমাত্রিক বিপর্যয়
২৪ঘণ্টা অনলাইন :

২৪ঘণ্টা অনলাইন : বাংলাদেশে হামের সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাব শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়, এটি রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতারও কঠিন পরীক্ষা। যে রোগের বিরুদ্ধে কার্যকর ও নিরাপদ টিকা বহু বছর ধরেই সহজলভ্য, সেই রোগেই যখন শত শত শিশু আক্রান্ত হয় এবং মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হয়, তখন প্রশ্নটি ভাইরাসের চেয়ে বেশি আমাদের নীতিনির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনার দিকে ফিরে আসে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চের মাঝামাঝি থেকে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে দেশের ৫৮টি জেলায় ১৯ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়; নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি রোগের বিস্তার নয়, বরং টিকাদান ব্যবস্থায় তৈরি হওয়া দীর্ঘদিনের সুরক্ষার ঘাটতির প্রতিচ্ছবি।
বাংলাদেশ একসময় হাম নিয়ন্ত্রণে দক্ষিণ এশিয়ার সফল উদাহরণ ছিল। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি লক্ষ লক্ষ শিশুকে সুরক্ষা দিয়েছিল। কিন্তু কোভিড-১৯–পরবর্তী সময়ে নিয়মিত টিকাদানে বিঘ্ন, সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা, প্রশাসনিক পুনর্গঠন এবং কিছু এলাকায় টিকা নিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা ধীরে ধীরে সেই সুরক্ষাবলয়কে দুর্বল করে দেয়। জনস্বাস্থ্যের একটি মৌলিক সত্য হলো হাম ঠেকাতে অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নিশ্চিত করতে হয়। সেই সীমা ভেঙে পড়লে ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
তবে এই সংকটের সবচেয়ে নির্মম দিক হলো এর বৈষম্যমূলক চরিত্র। ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি, দুর্গম গ্রাম এবং দরিদ্র পরিবারের শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। অপুষ্টি, সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়া এবং টিকার আওতার বাইরে থাকা এই তিনটি কারণ একসঙ্গে মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে হাম শুধু একটি ভাইরাসজনিত রোগ নয়; এটি দারিদ্র্য, বৈষম্য এবং দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থারও প্রতিচ্ছবি।
এই প্রাদুর্ভাব থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, জনস্বাস্থ্যে শূন্যতা কখনো দীর্ঘদিন শূন্য থাকে না; সেটি খুব দ্রুত সংকটে রূপ নেয়। জরুরি টিকাদান অভিযান প্রয়োজন, কিন্তু সেটিই শেষ কথা নয়। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিকে শক্তিশালী করা, ভ্যাকসিন সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা, রোগ নজরদারি আধুনিক করা এবং মানুষের মধ্যে টিকা বিষয়ে আস্থা ফিরিয়ে আনা এসবকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় তার আকাশচুম্বী ভবনে নয়, বরং তার শিশু কতটা নিরাপদ সেখানে। হামের এই প্রাদুর্ভাব আমাদের সেই আয়নায় দাঁড় করিয়েছে। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা আমরা কি এই সতর্কবার্তা থেকে শিক্ষা নেব, নাকি আরেকটি প্রতিরোধযোগ্য বিপর্যয়ের জন্য অপেক্ষা করব?
