প্রশ্নহীন সমাজ জ্ঞানগত পঙ্গুত্বে থাকে

২৪ঘন্টা অনলাইন : প্রশ্ন মানুষের জ্ঞানের প্রথম সিঁড়ি। শিশু যখন প্রথম "কেন" বলে, তখনই তার মনে জ্ঞানের বীজ রোপিত হয়। অথচ বড় হতে হতে এই স্বাভাবিক জিজ্ঞাসাপ্রবণতা পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজের চাপে ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে পড়ে। প্রশ্ন করতে শেখার বদলে আমরা শিখি দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে, বিচার-বিশ্লেষণের বদলে একতরফা রায় দিতে।
সম্প্রতি অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খানের একটি পুরনো মন্তব্য নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা এই প্রবণতারই জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। তিনি শহীদুল জহিরকে "তৃতীয় শ্রেণীর লেখক" বলে মন্তব্য করেছিলেন বলে জানা যায়। প্রশ্ন হলো—একজন জ্ঞানী, প্রগতিশীল অধ্যাপক কীভাবে এত সহজে কোনো লেখকের স্তর একতরফাভাবে নির্ধারণ করে দিতে পারেন? সাহিত্যে আসলে এমন কোনো পরম মানদণ্ড নেই। সাহিত্যের ইতিহাস বরং এর বিপরীত সাক্ষ্য দেয়—দুই দিক থেকেই।
একদিকে, জীবদ্দশায় উপেক্ষিত হয়েও মৃত্যুর পরে কালজয়ী হয়েছেন অনেকে। জীবনানন্দ দাশ জীবনে কটু সমালোচনার শিকার হয়ে মৃত্যুর পর বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নাম হয়ে উঠেছেন। ফ্রানৎস কাফকা জীবনে অপরিচিত থেকে মরণোত্তর বিশ্বসাহিত্যের অগ্রপথিক হয়েছেন।
অন্যদিকে, সমকালে প্রবলভাবে জনপ্রিয় হয়েও কালের গর্ভে হারিয়ে গেছেন অনেকে। রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাবের আগে হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কেই বঙ্গের শ্রেষ্ঠ কবি ভাবা হতো, আজ তিনি প্রায় বিস্মৃত। জার্মান নাট্যকার কোৎসেবু একসময় গ্যোটে-শিলারের চেয়েও বেশি মঞ্চস্থ হতেন, আজ বিশেষজ্ঞ বলয়ের বাইরে অপরিচিত। ইংরেজ ঔপন্যাসিক হল কেইন ছিলেন তাঁর যুগের সর্বাধিক বিক্রিত লেখক, আজ সাহিত্য-ইতিহাসের পাদটীকা মাত্র। অর্থাৎ সমকালীন প্রশংসা বা নিন্দা—দুটোই সময়ের পরীক্ষায় ভুল প্রমাণিত হতে পারে।
সমস্যা হলো, এই প্রবণতা সলিমুল্লাহ খানের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়—এটাই আমাদের জ্ঞানচর্চার সাধারণ চিত্র। আমরা প্রশ্ন করতে শিখি না, শিখি বিচার করতে। ফলে গড়ে ওঠে এক সংস্কৃতি—ক্ষেত্র বিশেষে কখনও কখনও সেটা বিচি হয়ে তরমুজ পরিমাপের মত হয়। এমন সংস্কৃতিতে নতুন সৃজনশীল ভাবনার জায়গা তৈরি হয় না; বরং সুশীল সমাজের অভ্যন্তরে দলাদলি, বিদ্বেষ ও ঘৃণার চর্চা বেড়ে যায়। কেউ অন্ধ মুরিদ, কেউ ঘৃণার চাষি—মাঝখানে যুক্তিনিষ্ঠ বিতর্কের জায়গা সংকুচিত হয়। সমাজ এভাবেই দুষ্টচক্রে আবদ্ধ হয়।
পক্ষপাতিত্বের এই অন্ধত্বই সমাজকে পঙ্গু করে তোলে। উত্তরণের পথ কী? জনাব খানের মতো বুদ্ধিজীবীরা এই প্রশ্নের জবাব দেন না; কিন্তু তাঁদের আত্মবিশ্বাসী একতরফা রায় থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, সমাজকে প্রশ্ন করতে শেখানোর বদলে তাঁরা বিশ্বাসী মুরিদ আর অবিশ্বাসী বিদ্বেষীর দুই প্রজন্ম গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখছেন।
আমাদের প্রয়োজন এমন বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতি, যেখানে কোনো রায়, এমনকি প্রতিষ্ঠিত বুদ্ধিজীবীর রায়ও, প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকবে না। প্রশ্নহীনতা থেকেই জন্ম নেয় জ্ঞানগত পঙ্গুত্ব; মুক্তির একমাত্র পথ প্রশ্ন করার সাহস ও সংস্কৃতি পুনরুদ্ধার।
