ছোট্ট রোজারিও থেকে লিও গল্প ছুঁয়েছে পৃথিবী

২৪ঘন্টা অনলাইন : ৩৯ বছর আগে আজকের দিনে, আর্জেন্টিনার ছোট্ট শহর রোজারিওতে জন্ম নেওয়া একটা শিশু জানত না, একদিন তার নামেই লেখা হবে ফুটবলের ইতিহাস। লিওনেল মেসি—নামটা উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মাঠের মাঝে এক জাদুকরের ছবি। কিন্তু এই জাদুর শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না।
ছোটবেলায় গ্রোথ হরমোনের ঘাটতিতে ভুগতেন মেসি। চিকিৎসার খরচ বহন করার সামর্থ্য ছিল না পরিবারের। তখনই এগিয়ে আসে বার্সেলোনা, আর তেরো বছরের এক কিশোর পাড়ি দেয় হাজার মাইল দূরের স্পেনে, পরিবার-পরিজন ছেড়ে। লা মাসিয়ার মাটিতে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়।
বার্সেলোনার জার্সিতে যত গোল, যত শিরোপা—সবকিছুই আজ ইতিহাস। কিন্তু সাফল্যের পথ মসৃণ ছিল না কখনোই। জাতীয় দলের জার্সিতে একের পর এক ফাইনাল হার, ২০১৬ কোপা আমেরিকার পর অবসরের ঘোষণা—সমালোচনার তীরে বারবার বিদ্ধ হয়েছেন তিনি। অনেকে বলত, ক্লাবের মেসি আর দেশের মেসি যেন দুই আলাদা মানুষ।
তবু হার মানেননি তিনি। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জিতে ভাঙেন আক্ষেপের শিকল, আর ২০২২ সালে কাতারের মাটিতে বিশ্বকাপ হাতে তুলে নিয়ে পূর্ণ করেন এক আজীবনের অপেক্ষা। ২০২৪ সালে কোপা আমেরিকার শিরোপাও ধরে রাখে তাঁর আর্জেন্টিনা। আট-আটটি ব্যালন ডি'অর, বার্সেলোনার ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা, এক ক্যালেন্ডার বছরে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড—ফুটবল যে রেকর্ড বই চেনে, তার প্রায় প্রতিটি পাতায় আজ মেসির নাম লেখা।
ইউরোপের রঙিন মঞ্চ ছেড়ে এক সময় পাড়ি দেন আমেরিকার মাটিতে, ইন্টার মায়ামির জার্সিতে। বয়সের ভারে অনেকে যখন থিতু হওয়ার কথা বলে, তখনই তিনি নতুন এক লিগে, নতুন এক সংস্কৃতিতে নিজেকে প্রমাণ করার সাহস দেখান, মাঠের বাইরেও ফুটবলকে নতুন এক দেশের কাছে পরিচিত করিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়ে।
এই উত্থানের পেছনে ছিলেন যাঁরা—বাবা হোর্হে মেসি, যিনি ছেলের চিকিৎসা আর ক্যারিয়ারের জন্য লড়েছেন আপ্রাণ; ছোটবেলার আদর্শ দিয়েগো মারাদোনা, যাঁকে দেখে বল পায়ে জাদু শেখার স্বপ্ন দেখতেন; আর বার্সেলোনার কোচ পেপ গার্দিওলা, যিনি তাঁকে রূপ দেন আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে নিখুঁত অস্ত্রে।
মাঠের বাইরের মেসিও কম মুগ্ধ করে না। ছোট্ট রোজারিওর প্রেম আন্তোনেলা রোকুজ্জোকে বিয়ে করে গড়েছেন এক সাজানো সংসার। তিন ছেলে থিয়াগো, মাতেও আর সিরোর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক যেন এক আদর্শ বাবার পাঠ—ম্যাচ জেতার পরও যে মানুষটা প্রথমে ছোটেন গ্যালারিতে বসা সন্তানদের কাছে। আর আন্তোনেলার পাশে তাঁর নিঃশব্দ দায়বদ্ধতা প্রমাণ করে, তারকা হয়েও মানুষ থাকা যায়, সংসারের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা যায়।
লিও মেসি ফাউন্ডেশনের হাত ধরে অসংখ্য সুবিধাবঞ্চিত শিশুর চিকিৎসা আর শিক্ষার দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি, ইউনিসেফের শুভেচ্ছা দূত হয়ে কাজ করেছেন বছরের পর বছর। যে শিশুটি একদিন নিজের চিকিৎসার খরচ জোগাতে পারত না, আজ সেই মানুষই হাজারো শিশুর ভরসার নাম হয়ে উঠেছে।
৩৯ বছরের লিওনেল মেসি আজও মাঠে নামেন সেই একই ক্ষুধা নিয়ে, যে ক্ষুধা নিয়ে নেমেছিলেন লা মাসিয়ার প্রথম দিনে। বয়স বেড়েছে, চুলে পাক ধরেছে কিছুটা, কিন্তু বল পায়ে সেই পুরনো ছেলেমানুষি আনন্দ আর ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা কমেনি এক বিন্দুও। যে ছেলেটা একদিন স্বপ্ন দেখত শুধু একটা সুস্থ শরীরের, সে আজ পুরো একটা প্রজন্মের স্বপ্নের নাম।
জন্মদিনে তাই শুধু একটাই কথা বলার থাকে—ধন্যবাদ, লিও। তুমি প্রমাণ করেছ, ছোট্ট শরীরের ভেতরেও থাকতে পারে পৃথিবী জয় করার মতো বড় একটা হৃদয়।
