কেইপিজেড: কর্ণফুলীর তীরে সবুজ শিল্পাঞ্চল

২৪ঘণ্টা অনলাইন: চট্টগ্রামের কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরে গড়ে ওঠা কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (কেইপিজেড) এখন বাংলাদেশের শিল্পায়ন, রপ্তানি আয় ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের এক অনন্য উদাহরণ। কোরিয়ান উদ্যোক্তা কিহাক সাংয়ের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই শিল্পাঞ্চলটি একদিকে যেমন রপ্তানি খাতে বড় অবদান রাখছে, অন্যদিকে তেমনি সবুজ শিল্পায়নের মডেল হিসেবেও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসা কুড়াচ্ছে।
প্রায় ২ হাজার ৪৯২ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই শিল্পাঞ্চলে বর্তমানে ৪৮টি কারখানা চালু রয়েছে। জুতা, পোশাক, টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন রপ্তানিমুখী পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার রপ্তানি আয় করেছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
বর্তমানে কেইপিজেডে প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করছেন, যাদের বড় অংশ নারী। নতুন বিনিয়োগ ও চলমান প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আগামী দুই বছরের মধ্যে এই সংখ্যা ৭০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সবুজ শিল্পের অনন্য মডেল: কেইপিজেডের প্রায় ৫২ শতাংশ এলাকা সবুজায়নের আওতায় রাখা হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত ২০ লাখের বেশি গাছ রোপণ করা হয়েছে। এছাড়া ১৭টি জলাধার তৈরি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) ও জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির মাধ্যমে এটিকে একটি পরিবেশবান্ধব শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।
শিল্পাঞ্চলের মাত্র ২০ শতাংশ জায়গা ব্যবহার হচ্ছে উৎপাদন কার্যক্রমে, বাকিটা সংরক্ষিত রয়েছে সবুজায়ন ও জীববৈচিত্র্যের জন্য। ফলে এটি শুধু শিল্প নয়, বরং একটি পরিবেশগত আবাসস্থল হিসেবেও বিকশিত হয়েছে।
রপ্তানি, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রভাব: ২০১২ সালে উৎপাদন শুরুর পর থেকে কেইপিজেডের রপ্তানি আয় ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বছরে প্রায় ২.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের পণ্য রপ্তানি হচ্ছে এখান থেকে, যা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
চীন, জাপান, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডসসহ বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীরা এখানে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির কয়েকটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানও কার্যক্রম চালাচ্ছে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উদ্যোগ: শিল্পের পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও বিনিয়োগ করছে কেইপিজেড। ইতোমধ্যে একটি হাসপাতাল ও নার্সিং কলেজ চালু হয়েছে। পাশাপাশি টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল ও আরও একটি আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের কাজ চলছে।
স্থানীয় অর্থনীতিতে পরিবর্তন: কেইপিজেডকে ঘিরে আনোয়ারা ও কর্ণফুলী অঞ্চলে ব্যাপক অর্থনৈতিক পরিবর্তন এসেছে। স্থানীয় ব্যবসা, পরিবহন, রেস্টুরেন্ট ও আবাসন খাতে নতুন কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধি পেয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, এই শিল্পাঞ্চল শুধু চাকরি নয়, পুরো অঞ্চলের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: কেইপিজেড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমানে আরও ৪০০ একর জমি শিল্পায়নের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। নতুন বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থান আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
কেইপিজেড ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহজাহান বলেন, “এই শিল্পাঞ্চল এখন শুধু বাংলাদেশের নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও একটি সফল সবুজ শিল্পায়নের উদাহরণ।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ নীতি সহায়তা ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা গেলে কেইপিজেড বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
